গারো সমাজে স্বোপার্জিত সম্পত্তির অস্তিত্ব ও উদ্ভূত সমস্যা | কার্তিক ঘাগ্রা | খু•রাং




গারোদের সামাজিক জীবনযাপন নিবিড়ভাবে পর্যবেক্ষণ ও গারো প্রথাসমূহ পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় গারো সমাজে ‘স্বোপার্জিত’ সম্পত্তি হলো সেই সম্পত্তি
পরিবারের কর্ত্রী বা মাতার মুত্যুর পর কন্যা যদি পিতার ভরণপোষণে অপারগতা, বা, না-রাজি থাকে, অস্বীকার করে, তবে পারিবারিক গারো প্রথানুযায়ী পিতাকে তার নিজের ভরণপোষণ ও আনুষঙ্গিক খরচ মেটানোর জন্য পারিবারিক সম্পত্তি থেকে কিছু সম্পত্তি দিয়ে থাকে যা পিতার মৃত্যুর পর প্রদত্ত সম্পত্তি পুনরায় পারিবারিক সম্পত্তিতে এসে পড়ে। কারণ প্রকৃতপক্ষে গারোদের সম্পত্তি ব্যক্তি সম্পত্তি না, মাহারি ও পারিবারিক সম্পত্তি। পিতা যদি এ সময় প্রদত্ত পারিবারিক সম্পত্তি থেকে আয় রোজগার করে সম্পত্তির বৃদ্ধি সাধন করে কেবলমাত্র ওই বর্ধিত সম্পত্তি পিতার স্বোপার্জিত সম্পত্তি হিসেবে গণ্য হবে। কেবল এ স্বোপার্জিত সম্পত্তি নিয়ে ইচ্ছে করলে সে কন্যার পরিবার থেকে পৃথক হয়ে যেতে পারে, কিংবা পুনরায় বিবাহ করে নতুন ঘর-সংসার করতে পারে। কেবলমাত্র এ স্বোপার্জিত সম্পত্তিই তার মৃত্যুর পর পুনরায় বিবাহ করা স্ত্রী উত্তরাধিকার প্রাপ্ত হবে। অথবা এ স্বোপার্জিত সম্পত্তি সে তার ছেলেমেয়েদের মাঝে সমান অংশে ভাগ করে দেবে, বা, তার মর্জিমতো কম-বেশি দেবে।

অধুনা গারো সমাজে চিরাচরিত যে গারো পারিবারিক কাঠামো, প্রথা বা চল ছিল এর বাইরে অনেক ঘটনায় ঘটে থাকে। এর মধ্যে পারিবারিকভাবে খরিদা ভূমি অনেক সময় পুরুষ তার নিজের নামে করে থাকে। ‍কিংবা স্ত্রীর মাহারি থেকে প্রাপ্ত সম্পত্তি দখল মূলে নিয়ে নিজের নামে করে থাকে। যদিও গারো প্রথানুযায়ী পারিবারিকভাবে খরিদা ভূমি ও পারিবারিক সম্পত্তির প্রকৃত ও একচ্ছত্র মালিক গৃহের কর্ত্রী কিংবা ইতোপূর্বে যিনি ওই পরিবারের নকনা নিযুক্তা হয়েছেন।

প্রচলিত এ রীতির অবমাননা এখন গারো সমাজে হরহামেশা দেখতে পাওয়া যায়, বিশেষ করে বাংলাদেশে। বস্তুত পারিবারিকভাবে খরিদা ভূমি গৃহের কর্তা পুরুষ নিজের নামে করে দূরদর্শিতার পরিচয় দিলেও প্রকৃতপক্ষে এটা যুগ যুগ ধরে বা আবহমানকাল থেকে চলে আসা গারো সমাজের সামাজিক, পারিবারিক ও মূল্যবোধ পরিপন্থী। প্রথা অবমাননা, মাহারি ও বংশানুক্রমে পরিবারের ভাবী উত্তরাধিকাদের সাথে চরম হঠকারি। আর পক্ষান্তরে এসব কর্মকান্ডই গারো সমাজ, প্রথা ও গারো পারিবারিক উত্তরাধিকার কাঠামোকে হুমকির মুখেই ঠেলে দেয়।

অন্যদিকে গারো সমাজে এরকম ঘটনা আকছার ঘটছে বলেই গারোদের জমিজমা নিয়ে সমস্যা দেখা দিলে, মামলা মোকদ্দমা হলে, কোনভাবে জমি পুরুষের নামে হলে ‘স্বোপার্জিত’ শব্দটি মোকদ্দমায় জেতার কৌশল হিসেবে এখন ব্যবহৃত হচ্ছে আর অজান্তেই প্রচলিত গারো উত্তরাধিকার প্রথাকে ভুলভাবে উপস্থাপনও করা হচ্ছে, হেয় করা হচ্ছে এবং মোকদ্দমাও সেইভাবে পরিচালনা করা হচ্ছে। যা আদৌ কাম্য নয়।

Post a Comment

0 Comments