থমাস স্নালের সাথে আলাপচারিতা : আমাদের সমাজে কোন অনুশাসন নাই | কার্তিক ঘাগ্রা | খু•রাং

 

[থমাস স্নালের সাথে দেখা করার উদ্দেশ্য নিয়ে ২০১৬ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবরের শেষদিকে হালুয়াঘাটের কুমুরিয়া গিয়েছিলাম। এটিই ছিল আমার সাথে উনার প্রথম দেখা। এর আগে আমরা কেউ কাউকে দেখি নি। এর আগে উনার সম্বন্ধে আমার কোন পূর্বধারণাও ছিল না। দু’এক কথার পর উনি বলেছিলেন, অনেক জায়গায় গারোদের সাথে আলাপ করে জেনেছি, গারো সমাজের অধিকাংশ লোকদেরই গারোদের সামাজিক বিধি-বিধান সম্পর্কে পরিছন্ন ধারণা নাই। তাদেরকে পরিছন্ন ধারণা দেওয়ার উদ্দেশ্যেই ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে স্বর্গীয় জবাং ডি. মারাকের ‘অব দি গারো ল’ বইটি আমি বাংলায় অনুবাদ করি এবং স্বর্গীয় রেভা. ডি. কে. বনোয়ারীর চেষ্টায় ও বরদাকান্ত সাংমার প্রকাশনায় অনুবাদ গ্রন্থটি প্রকাশ করি। মূলত এ বইটির নতুন সংস্করণ প্রকাশের উদ্দেশ্যে নিয়েই লেখকের কাছে যাওয়া।]

—কার্তিক ঘাগ্রা।

 

উঠোনে, গাছের ছায়ায় বসে আমরা টুকিটাকি আলাপ সারছিলাম এবং আলাপচারিতাকে এগিয়ে নিতে, দীর্ঘ করতে, জিজ্ঞেস করতেছিলাম, আমাদের এ দশা কেন? সমাজ বা আমরা বিপন্নের দিকে এগিয়ে যাচ্ছি কেন? উনি বললেন, উত্তর দক্ষিণ পূর্ব পশ্চিম যেদিকেই যাই, দেখি, আমাদের সমাজে কোন অনুশাসন নাই। সুশৃঙ্খল জীবন-যাপনের জন্য ন্যুনতম যে অনুশাসন দরকার, নাই। আমার গ্রামের মতোই সব গ্রামের অবস্থা। আমার গ্রামের মাতব্বরেরা কখনো-সখনো আমার কাছে আসে পরামর্শের জন্য, কীভাবে গ্রামের হাল নিয়ন্ত্রণ করা যায়? সত্যি কথা কী, পরামর্শ দিয়ে কোন লাভ নাই। মাতব্বরদেরকেই তো মানানো যায় না। অথচ এরাই পরামর্শ নিতে আসে। তাদের বলি, আমাদের ছেলেপেলেদের, গ্রামের, ভবিষ্যত প্রজন্মের কথা ভেবেও আমাদের জীবনাচরণে পরিবর্তন আনা দরকার। প্রথমত দোকানে গেলেই অবাধে চু পাওয়া যায় এটাকে বন্ধ করতে হবে। দ্বিতীয়ত মুই-মুরব্বিদের পানাহারেও নিয়ন্ত্রণ করতে হবে। পান করলেও ঘরে বসে সল্প সময়ে পরিমিত পান করতে হবে। ছেলেপেলেদের ঠেকাতে চাই, আগে নিজেদের ঠেকাতে হবে।

—আমরা তো কথায় কথায় বলি, বা, ধারণ করি, চু আমাদের সংস্কৃতি; এ নিয়ে আপনার বক্তব্য কি?

—অনেকটা খাদ স্বরে, চু-কে কেন যে আমরা সংস্কৃতি বলি, এটা ভেবে আমিও বিস্মিত হই। সংস্কৃতি হলো মানব জীবনের আলো। এখন, কেন যে আমরা বলি—এটা হয় আমরা সংস্কৃতি জানি না, নয়তো আমরা এখনও সভ্য শিক্ষিত হয় নি। একবার এক ফরেনার ফাদার আমাকে বলেছিল, তোমাদের জীবনযাপন কেন এরকম? সেই আদিম সমাজেই যেন রয়ে গেছে! আমরাও ওয়াইন পান করি, কিন্তু তোমরা যেভাবে চু নিয়ে ব্যস্ত হও, দল বেঁধে, হৈ-হল্লা করে, পাড়া-মহল্লা মাতিয়ে, আসর করে, আমরা এভাবে ওয়াইনের পেছনে সময় নষ্ট করি না। পাঁচ-দশ মিনিটে, কেবল শরীরটাকে গরম রাখার জন্যই পান করি। আর তোমাদের দেশের যে আবহাওয়া চু খাওয়ার তো দরকার পড়ে না।

চা বিস্কুট খেতে খেতে, দক্ষিণ পাড়ায় যেখানে আজকে বিয়ে হচ্ছে, ওই বাড়ির কর্তা একবার আমাকে বলতেছিল, মেঘালয়ের গারোরা অনেক এ্যাডভান্স হয়ে গেছে। শুনে আমি খানিক চুপ থেকে বললাম, এ্যাডভান্স বলতে তুমি কি বোঝ আমি জানি না। আমি যা জানি, যে জাতির সংস্কৃতি যত উন্নত ওই জাতি তত উন্নত। কই? টুরা চ্যানেলে তো এ্যাডভান্সের লেশমাত্রও দেখি না। আদিমতার আদিখ্যেতা ছাড়া! আর বোতলে তো লেখায় থাকে ‘ওনলি ফর মেঘালয়া’! একবার তো এক সরকারী বড়ো কর্মকর্তার কাছে গিয়েছিলাম, সে মদ রাখার জন্যই আলাদা দু’টো রুম রেখেছে। উৎকোচ হিসেবে নাকি মদ পায়! তার সাথে কথা বলে তো আমি হতাশই হলাম। সর্বদা মদের নেশাতেই ডুবে আছে। এই হলো মেঘালয়ের এগিয়ে যাওয়া। শুনে তার মুখে আর রা নাই।

—তা সমাজ নিয়ে আমরা আশাবাদী হবো, বা, আপনি কি আশাবাদী? সঞ্জীব দ্রং ওয়ানগালা করে একরকম চু পান করাকে ফের প্রতিষ্ঠা করেছে! এর আগে পরিস্থিতি ভিন্ন ছিল। ওপেনলি ব্যবহার নেই বললেই ছিল। যুবকরা এরকম আসক্ত ছিল না। আমরা যাদেরকে আইডল ধরি, তারা তো অনুকরণীয়। আমি বা আমরা সঞ্জীব দ্রং-এর ওয়ানগালাকে আশীর্বাদ মনে করি না।

—খানিক থেমে, সমাজ নিয়ে আমি হতাশ। কোন আশাই দেখি না। সঞ্জীব দ্রংকে দিয়েও আশা করা যায় না। সে উল্টো এটাকে ওয়ানগালা করে করে প্রজন্মকে উৎসাহিত করছে। সে একজন কলামিস্ট, তাঁর কাছে সমাজ নিয়ে, প্রগতি নিয়ে যে আশা করেছিলাম সেটা হবার নয়। সে ওই মাপের লোক নয়। সে হলো স্বার্থচিন্তা চমৎকারার মতো। একবার প্রমোদ মানকিনকেও বলেছিলাম, সে তখন এমপি। তাঁর সাথে একসাথে শিক্ষকতা করেছি। তাকে আমি চিনি, জানিও হয়তো। বলেছিলাম, তোমার তো এখন দল আছে, যশ আছে, খ্যাতি আছে, প্রভাব আছে, আমাদের সমাজের সামাজিক পরিবর্তন নিয়া একটা পদক্ষেপ নেও। একটা সমাজ তো যুগে-যুগে, কালে-কালে, এভাবে চলতে পারে না। সে বললো, আমি কী করবো? আসলে সেও তো ওইরকমই আমার গ্রামের মাতব্বরদের মতোই! আমার মতে সে ছিল নিজের জন্য নেতা, পরিবারের জন্য নেতা, হয়তো আত্মীয় স্বজনদের জন্য নেতা। প্রকৃত নেতা ছিল না। সামাজিক নেতা ছিল না। তারপরও আমার মনে হতো, সে চাইলে পারতো। মনে হয় আমাদের সমাজে সামাজিক নেতা জন্মাবে না। না-কি জন্মাবে?

পেটের দায়ে হোক, বা, অন্য কোন দায়ে হোক, আমাদের লোকেরা প্রায় গ্রাম শূন্য করে শহরে ভিড় করছে। শহরে দেশি-বিদেশী বহু লোক থাকে। বড় বড় মানুষ থাকে। মানুষ তো অন্যদের উন্নত জীবনাচরণ দেখেও অনেক কিছু শেখে। আমাদের লোকদের শুনি, চু’র ব্যবসা পেতেছে। অমোককে মাতাল অবস্থায় পুলিশ ধরেছে। ছেলেপেলেরা চু খেয়ে মারামারি করেছে। মেয়েরা অন্য জাতির কাছে বিয়ে বসছে। ছেলেমেয়েদের মধ্যে আদব ব্যাপার নাই। পিতা-মাতা ও বয়োজ্যেষ্ঠদের কথা শুনে না। পরিবর্তন তো না উল্টো বিকলাঙ্গ সমাজের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে।

ঢাকায় বা অন্য কোনখানে আমাদের মেয়েরা যে অন্য জাতিকে বিয়ে করছে, বিয়ে করে বাড়িতে আনছে, মান্দি ছেলেকে বিয়ে করে আনার মতো অবাধে সমাজে ওঠছে, বসছে, থাকছে! কে কিভাবে নেয় আমি জানি না, আমরা তো সংখ্যাগুরু নয় যে জাতিসত্তার সমস্যা হবে না? সংখ্যায় আমরা এত অল্প এখানে একটা গর্হিত কাজ ঘটলে ওই বকশিগঞ্জে গিয়েও শোনা যায়। খুব খারাপ লাগে, যদিও কথাগুলো হাই-থটের সাথে যায় না কিন্তু ক্ষুদ্র জাতিসত্তাগুলো পৃথিবীতে এভাবেই নিশ্চিহ্ন হয়। অনুশাসন থাকলে এরকম হতো না। বিরিশিরির গারোরা গারো ভাষা বলে না, এটা তো অন্যায়ের মতো—গারো ভাষা বলতে তারা দোটানায় পড়ে, কুন্ঠিত হয়!

—বললাম, বলা হয় সুভাষ জেংচাম সমাজের বিদগ্ধ মানুষ, সামনের কাতারের, গারো আইনজ্ঞ, উনার সামাজিক অবস্থান নিয়ে একদা তীব্র সমালোচনা ছিল। হয়তো এখনও। উনার কাছেও তো এরকম কাক্সক্ষা করা যায় না। অথচ তাঁর দিক থেকেও গতানুগতিক ধারা ঘটলো! প্রাজ্ঞজন, অনুকরণীয় হতে পারতেন। হলেন না।

—অনেকক্ষণ চুপ থেকে বললেন, অনুশাসন থাকলে হয়তো বাধ্য হতেন।

—আচিক সংঘ নিয়ে কিছু বলেন।

—আচিক সংঘ! তখন দীনেশ মৃ সভাপতি, অনুকূল ঘাগ্রা সাধারণ সম্পাদক। ১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে হিন্দুদের সাথে সাথে গারোরাও নিজ আসং ছেড়ে পালিয়ে যায়। তখন তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা আসং ছেড়ে পালিয়ে যেতে বলেছেন কিনা? তাঁরা বললেন, না, আমরা তো বলি নাই। তখন আচিক সংঘের মিটিং হয়েছিল ঘোষগাঁওয়ে। ওইটাই শেষ মিটিং। মিটিং-এর পর নেতারাও পালিয়ে যায়। আমি তাঁদের জিজ্ঞেস করলাম, আপনারা পালালেন কেন? কী প্রয়োজন ছিল? আপনারা আসং ছেড়ে পালালেন? তাঁরা বললেন, রাজনৈতিক সমস্যা ছিল। সরকারের ধর-পাকড়ের পরোয়ানা ছিল। জিজ্ঞেস করলাম, তাহলে আপনারা কীভাবে নেতা হলেন? আচিক সংঘ কী রাজনৈতিক সংগঠন ছিল? তাঁরা বললেন, না। তবে রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টি ছিল। তাঁদের স্যার ক্ষিরোদ স্যানাল কমিউনিস্ট করতো। তোমরা মনে হয় টংক আন্দোলন শুনেছ?

—ছোট করে বললাম, হ্যাঁ।

—১৯৫০ খ্রিস্টাব্দে টংক আন্দোলন শুধু টংক ব্যবস্থাকে রদ করার জন্য আন্দোলন ছিল, গারোদের স্বাধীনতা সংগ্রাম তো ছিল না। বললাম, এইটা আপনারা কেন লোকদের বোঝাতে পারলেন না? তাঁরা বললেন, হ্যাঁ, এটাই আমাদের দুর্বলতা। আমি তাঁদের বললাম, আমি দুর্বলতা সবলতা বুঝি না। আসলে রাজনৈতিক সম্পর্কে আপনাদের ধারণা অপরিছন্ন। আপনারা ভাল জানেন না। তখন আর কোন জবাব নাই।

Post a Comment

0 Comments