সেই সময়ে যখন গ্রামের মোড়লেরা মাটির দালানের ওপর কোনরকম টিনের চালা দিত, মফস্বল শহরেও যখন দোতলা ঘর ওঠে নি, সেই সময়ে পদ মোড়লের দু’টি বিশাল ইট-সিমেন্টের দোতলা ঘর ছিল। সন্ধ্যা থেকে গভীর রাত অব্দি জেনারেটরের বৈদ্যুতিক আলো ঝলমল করতো। দূরের পথচারিরা দূর থেকে তাকিয়ে দেখতে দেখতে যেত।
তাঁর একটা (ভাল) নাম ছিল- হরিপদ রিছিল। তিনি এ নামে এত পরিচিত ছিলেন না। খুব কম লোকই তাঁকে এ নামে চিনতো, জানতো।
গত শতকের গোড়ার দিকে ১৯০৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ ফেব্রুয়ারি তিনি এ ধরাধামে জন্মগ্রহণ করেছিলেন। আশি দশকের শেষদিকে এলাকার লাখো মানুষের আশা আকাঙ্ক্ষা পূরণে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীও হয়েছিলেন। তাঁর নির্বাচনী মিছিলে মাইলের পর মাইল মানুষের সমাগম হয়েছিল। একথা অনেকে স্মৃতিচারণ করে বলেন, সেটা ছিল এক অভূতপূর্ব দৃশ্য। নির্বাচনী উম্মাদনাকে ছাপিয়ে যেন হয়ে ওঠেছিল আবালবৃদ্ধবনিতার মহোৎসব।
“ধনাধ্য হলেও তিনি ছিলেন নিরহঙ্কারী, মাটির মানুষ। এলাকার ছোট-বড় সবাই তাঁকে পছন্দ করত। ভালবাসত। যত গরীবই হোক মানুষকে তিনি অমর্যাদা করতেন না, তুচ্ছ জ্ঞান করতেন না। দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়াতেন।”
পাকিস্তান পিরিয়ডেও তিনি একটানা ১১ বছর ইউনিয়ন পরিষদের প্রেসিডেন্ট ছিলেন (১৯৫২-১৯৬২)।
এলাকার লোকেরা বলেন, ধনাধ্য হলেও তিনি ছিলেন নিরহঙ্কারী, মাটির মানুষ। এলাকার ছোট-বড় সবাই তাঁকে পছন্দ করতো। ভালবাসতো। যত গরীবই হোক মানুষকে তিনি অমর্যাদা করতেন না, তুচ্ছ জ্ঞান করতেন না। দুঃসময়ে পাশে এসে দাঁড়াতেন। সামাজিক কর্মকাণ্ডগুলোতেও সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দিতেন। লোকেরা আরও বলেন, প্রকৃত ধনীরা অহঙ্কারী হন না। পদ মোড়ল ও তাঁর উত্তরসূরীরাই এর প্রমাণ।
স্মৃতি থেকে হাতড়িয়ে তাঁর ছেলে পৌল চিসিম বলেন, ‘এড. প্রমোদ মানকিন তখন রাজনীতিতে নবীন, এমপি নমিনেশনের প্রার্থী, আমার বাবা ঢাকায় গিয়ে দলের প্রধান শেখ হাসিনার সাথে আলাপ করে প্রমোদ মানকিনের প্রার্থীতা চূড়ান্ত করেছিলেন। শুধু এটুকু করেই তিনি ক্ষান্ত হন নি, নির্বাচনকালীন সময়ে পায়ে হেঁটে প্রতিটা ঘরে গিয়ে প্রমোদ মানকিনের পক্ষে ভোট প্রার্থনা করেছিলেন।’
দেশভাগের আগেও তিনি ‘আচিক সংঘ’ নামে গারোদের যে সংগঠন ছিল এ সংগঠনের সাথে জড়িত ছিলেন। সে সময় বৃহত্তর ময়মনসিংহের ইন্ডিয়া সীমান্ত লাগোয়া পাঁচটি থানা ইন্ডিয়ার মেঘালয় রাজ্যের সাথে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কথা ছিল। এ উদ্দেশ্যে আচিক সংঘ থেকে বিনয় ভূষণ সাংমা (বিলু বাবু)কে দিল্লির উদ্দেশ্যে গরুর গাড়িতে করে পাঠিয়েছিলেন। কথিত আছে, তিনি দিল্লি যান নি, বা, যেতে পারেন নি। শুকনাকুড়ি থেকে ফেরত চলে এসেছিলেন। পরে পদ মোড়ল, দীনেশ মৃ, অনকূল ঘাগ্রারা কলকাতা গিয়েছিলেন। সেখানে এক উকিলের সাথে তাঁদের কথা হয়। ওই উকিল নথিপত্র দেখে তাঁদের বলেন, ‘আপনারা দেরি করে ফেলেছেন, এখন দিল্লিতে গিয়ে কোন লাভ হবে না।’ পরে কলকাতা থেকে তাঁরাও ফেরত চলে এসেছিলেন। অন্যসূত্রে জানা যায়, বিলু বাবুকে ক্যাপ্টেন উইলিয়াম মেঘালয় হয়ে যেতে বলেছিলেন। কথা ছিল সেখান থেকে তাঁরা একসাথে দিল্লি যাবেন। কিন্তু ক্যাপ্টেনের কথা তিনি শুনেন নি।
১৯৬৪-এর রায়তের সময়ও মানুষ যখন দলে দলে ঘর-বাড়ি ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে, জায়গা-জমি ছেড়ে, সীমানা পেরিয়ে ইন্ডিয়ায় পাড়ি দিয়েছিল, গ্রামগুলো যখন মানুষ শূন্য হয়ে গিয়েছিল, এমনকি তাঁর বড় জামাই বিভাস রিছিল ও ছোট জামাই প্রভাস রিছিলও যখন তাঁকে ছেড়ে সীমানা পেরিয়ে চলে গিয়েছিল তিনি ঘর ছেড়ে, গ্রাম ছেড়ে পালিয়ে যান নি।
পদ মোড়ল কেবল রাজনৈতিক সচেতন ব্যক্তিই ছিলেন না, ব্রিটিশ পিরিয়ডে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের আগে তিনি রংপুরে তামাক চাষ করে তামাকের ব্যবসাও করেছিলেন। হালুয়াঘাট ও বাঘাইতলা বাজারে ধান ও মুদি দোকানের ব্যবসাও করেছিলেন। ডালু (বর্তমানে ইন্ডিয়া)তেও ব্যবসা করেছিলেন।
এ কিংবদন্তি প্রবাদ পুরুষ ২০১৫ খ্রিস্টাব্দের ১০ ফেব্রুয়ারি ১০৬ বছর বয়সে এ ধরাধাম ছেড়ে পরপারে পাড়ি দেন। তাঁর মৃত্যু তারিখ জানতে গিয়ে এক অদ্ভুত আশ্চর্য মিলের কথাও জানা হয়- যে মাসের যে তারিখে তিনি জন্মগ্রহণ করেছিলেন ঠিক ওই মাসের ওই তারিখের পরের তারিখেই তিনি মৃত্যুবরণ করেছিলেন।



0 Comments