আমার আত্মজীবন কথা | থমাস স্নাল | খু•রাং

[থমাস স্নালএকজন লেখক, সমাজ চিন্তক ও শিক্ষক। তিনি পাকিস্তান পিরিয়ডে বেগম পত্রিকায় নিয়মিত প্রবন্ধ লিখতেন। ১৯৭৭ খ্রিস্টাব্দে জবাং ডি. মারাকের ‘অব দি গারো ল’ বইটি বাংলাদেশী গারোদের কথা চিন্তা করে ‘গারো আইন’ নামে বাংলায় অনুবাদ করেন। তার কথা মতো এর পর তিনি লেখালেখি থেকে নিজেকে গুটিয়ে নেন। ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি তিনি জন্ম গ্রহণ করেছিলেন। ৭৪ বছর বয়সে দীর্ঘদিন নানা রোগে ভোগে শয্যাশায়ী হয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি ২০২১ সকালে নিজ বাড়ি ময়মনসিংহ জেলার হালুয়াঘাট উপজেলার কুমুরিয়া গ্রামে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন।]

———————

সুজলা শ্যামলা শস্য শ্যামলা পিপ পাপিয়ায় ভরা, বন বিথীকায় ঘেরা, আমাদের রূপসী বাংলার ময়মনসিংহ জেলার প্রত্যন্ত এলাকার হালুয়াঘাট থানার কিসমত নড়াইল গ্রামের এক মধ্যবিত্ত গারো পরিবারে আমার জন্ম ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দের ১৭ জানুয়ারি। আমার পিতার নাম এসিং মারাক। মাতার নাম নিরুপমা স্নাল। আমরা তিন ভাই-বোন। ভাই-বোনদের মধ্যে আমিই সর্বকনিষ্ঠ।

আমার জ্ঞানের পরিপক্কতার আগেই আমার পিতা মৃত্যুবরণ করেন। জ্ঞানের পরিপক্কতা আসার পর হতে আমি আমার মাকে সংসার পরিচালনা করতে দেখেছি। বস্তুত, আমি আমাদের চাকরদের দ্বারাই সেবাযত্ন লাভ করেছি। আমাদের চারজন পুরুষ চাকর ছিল। এদের মধ্যে পানিয়া নামের চারকটি আমাকে দেখাশোনা করত। স্কুল গমনের বয়স হলে আমার মা পানিয়াকে দিয়েই আমাকে নড়াইল প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠায়। আমার প্রাথমিক শিক্ষা সমাপনীর পর মা আমাকে হালুয়াঘাটের সাধু আন্দ্রিয় মিশন বোর্ডিং স্কুলে ভর্তি করে দেন। নিম্ন মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষা সমাপনির পর আমাকে ময়মনসিংহের এডুয়ার্ড উচ্চ বিদ্যালয়ে ভর্তি করে দেন। এরপরে ময়মনসিংহের নাসিরাবাদ কলেজিয়েট উচ্চ বিদ্যালয় থেকে ১৯৬৫ খ্রিস্টাব্দে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর নাসিরাবাদ নাইট কলেজে ভর্তি হয়ে যাই। এর পাশাপাশি ময়মনসিংহের সেন্ট মিখায়েলস হাসপাতালে পার্ট টাইম চাকরি করি। এরপর ফাদার রেভা. বোর্ডি সিএসসি মহাশয়ের সহায়তায় সিলেট শ্রীমঙ্গল পৌড়সভায় হিসাব রক্ষকের চাকরি নিই। এভাবে আমার নাইট কলেজের শিক্ষা সম্পন্ন হয় ১৯৬১ খ্রিস্টাব্দে। এরপর বিড়ইডাকুনী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ফাদার পিটার গমেজের সহায়তায় বিড়ইডাকুনী উচ্চ বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করি। ১৯৭০ খ্রিস্টাব্দের জানুয়ারি মাসে তদানীন্তন ঢাকা ডায়োসিসের আর্চ বিশপ টি. . গাঙ্গুলি আমাকে ময়মনসিংহ জেলার কাথলিক প্রাথমিক বিদ্যালয় সমূহের পরিদর্শক নিযুক্ত করেন। এর মধ্যে আমি বেসিক ট্রেনিং ইন ইডুকেশন (শর্ট কোর্স) নিয়ে পরিদর্শকের কাজ বহাল তবিয়তে করে যেতে থাকি।

১৯৭১ খ্রিস্টাব্দের ২৭ এপ্রিল মুক্তি সংগ্রামের সময় আমি ভারতে চলে যাই। স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে এসে নিজ পদেই চাকরিতে যোগদান করি। সময়ে আমি আমার চাকরির নিশ্চয়তা ভবিষ্যৎ সম্পর্কে চিন্তিত হয়ে পড়ি।

সময় হালুয়াঘাট থানার থানা শিক্ষা অফিসার আব্দুল সাত্তার সাহেবের সাথে পরামর্শ করে ১৯৭২ খ্রিস্টাব্দে প্রাথমিক শিক্ষক বাছাই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করি। জুলাই মাসে বাছাই পরীক্ষার ফলাফল প্রকাশ হয়। তাতে দেখা যায়, তালিকার প্রথম দিকে আমার নামও রয়েছে।

১৯৭৩ খ্রিস্টাব্দের জুন মাসে আমি সরকারি স্কুলে শিক্ষকতার নোটিশ পাই। এর পরিপ্রেক্ষিতে আমি কাজে যোগদান করি হালুয়াঘাট থানার নং যুগলী ইউনিয়নের ছাতুগাঁও সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে কুমুরিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসি। ১৯৭৮ খ্রিস্টাব্দের সেপ্টেম্বর জেলা প্রাথমিক প্রধান শিক্ষক পদে উন্নীত হই এবং শিমুলকুচি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রধান শিক্ষকের দায়িত্ব নিই ১১ সেপ্টেম্বর কাজে যোগদান করি। ১৯৮১ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে দক্ষিণ হালুয়াঘাটের সুদর্শনখিলা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে যাই। ১৯৮২ খ্রিস্টাব্দের মে মাসে পটুয়াখালি জেলায় সহকারি থানা শিক্ষা অফিসার পদে নিয়োগপ্রাপ্ত হই। কিন্তু তৎকালীন সময়ের প্রেক্ষিতে পটুয়াখালি যাওয়ার সিদ্ধান্ত পরিত্যাগ করি। কেননা, তখন থানা শিক্ষা অফিসারের পদ গেজেটেড ছিল না। এরপর ১৯৮৪ খ্রিস্টাব্দের অক্টোবর মাসে ১১ অক্টোবর বাউসা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে বদলি হয়ে আসি এবং বিদ্যালয় থেকে ২০০১ খ্রিস্টাব্দের ৩০ জুন আমি অবসর গ্রহণ করি। অধ্যাবদি অবসর জীবনযাপন করছি।

অনুলিখন : দেবাশীষ স্নাল। 

Post a Comment

0 Comments