শ্রদ্ধাঞ্জলি | ড. রবিন্স বার্লিং : একজন গারো গবেষক - ২ | তর্পণ ঘাগ্রা | খু•রাং

 


[ড. রবিন্স বার্লিং, একজন আমেরিকান নাগরিক। এ উপমহাদেশের মেঘালয় (ভারত) বাংলাদেশী গারোদের সাথে পঞ্চাশ বছরের অধিক সময় নিরবচ্ছিন্ন থেকে গারোদের নিয়ে নিবির পর্যবেক্ষণ গবেষণা করেন। গারোদের অনুৎঘাটিত ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি ভাষার মূল উম্মোচিত করেন। বলতেন, গারো সভ্যতা পৃথিবীর অনেক পুরনো সমৃদ্ধ সভ্যতা। এরকম সমৃদ্ধ সভ্যতা খুব কম জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দেখা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় এরকম পুরনো সমৃদ্ধ সভ্যতা ধরে রেখে গারোরা নিজেদেরকে পৃথিবীতে মেলে ধরতে পারে নি। নিজেদের ইতিহাস ঐতিহ্য সংস্কৃতি সভ্যতার মূল্য বুঝে নি, সংরক্ষণ ও চর্চায় মনোযোগী হয় নি, হারিয়ে ফেলেছে! গুণী ব্যক্তিত্ব গত জানুয়ারি ২০২১ খ্রিস্টাব্দ নিজ দেশ আমেরিকাতে মারা যান। গারো আচিক (লেখ্য) ভাষায় তিনি অনর্গল কথা বলতে পারতেন। তিনি জন্মেছিলেন ১৮ এপ্রিল ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দ।]

———————

. রবিন্স বার্লিং সম্পর্কে এখনো লেখা শেষ হয় নি, আরেকটু না লিখলে যেন অপূর্ণতা থেকে যাবে। তিনি বলতেন, তোমাদের গারো আচিক ভাষা খুবই ভাল, এখনো নামের ভাষার মূল বা আসল ইতিহাস খুঁজে পাওয়া যায়। যেমনমা শব্দটিকে গারোরাআমাবলে। কেন আমা বলে? আলদো মিকথাংআনা আমা বলে।

 এভাবে বিড়ালকে গারো ভাষায় মেংগ নাম দিয়েছে। কেন এরকম নাম দিয়েছে? বিড়াল মেং মেং ডাকে, ডাক শুনে তার নাম গারোরা মেংগ নাম দিয়েছে। আরো বলা যায়, জিলমা জিলমা দংআনা দওজিলমা, নিনা চিরংআনা দওচিরং। এভাবে ভাষা থেকে মূল খুঁজে পাওযা যায়।

তিনি বলেন, খুঁজে দেখুন পৃথিবীর অধিকাংশ ভাষারই এরকম মূল খুঁজে পাওযা যায় না। তিনি দূঃখ করে বলেন, আমি বাংলাদেশের গারোদের আচিক ভাষায় প্রশ্ন করি তারা উত্তর দেয় না, তাকিয়ে থাকে। এত ভাল সুন্দর মায়ের ভাষাকে তারা মূল্য দেয় না। আর শিক্ষিত গারোরা আমি গারো ভাষায় বলি, আর তারা ইংরেজিতে উত্তর দেয়। জাতির ভাষা সংস্কৃতির মা-বাবা আছে কিন্তু নিজের ভাষা হারিয়ে বাংলা ইংরেজি ভাষার মা-বাবাকে আমার বললে হবে না। নিজেরটা ঠিক রেখে শত জাতির ভাষা শেখা যায়। আমাকে বলেন, ব্রাদার গিয়োম ভাল মানুষ, তার সহযোগিতায় মায়ের ভাষা শেখাতে চেষ্টা করো।

 তিনি আরও মূল্যবান কথা বলেছিলেন, প্রাচীন গারো রাজা-নকমারা খুবই দূরদৃষ্টি সম্পন্ন ছিলেন। হাজার বছর পর গারোদের অবস্থা কি হবে -সকল ভালভাবে চিন্তা-ভাবনা করে ভূমি সম্পত্তির আইন-কানুন তৈরি করেছিলেন। তারা সম্পদগুলো ব্যক্তি সম্পত্তি করেন নি, মাহারি সম্পত্তি করেছিলেন। মেঘালয়ে এখনো গারোদের সম্পত্তি মাহারি সম্পত্তি। মাহারি সম্পত্তি ইচ্ছে করলেই বিক্রি করা যায় না। মাহারি সম্পত্তি বিক্রি যোগ্য নয়। যার কারণে গারোদের এক শতাংশ জমি নষ্ট হয় না, হারিয়ে যায় না। নিয়ম না থাকলে কবে মেঘালয়ের গারোরা ত্রিপুরা রাজ্যের মতো হয়ে যেত। গারো হিলসের গারোদের জমি-জমা মাহারির কাজ থেকে সন পাত্তা, মেয়াদি পাত্তা নিয়ে জমি ভোগ করতে হয়। মাহারির সম্পত্তি গারো ছাড়া অন্য জাতির নেওয়ার কোন সুযোগ নেই। মাহারি সম্পত্তি বিক্রি করতে চাইলে সব মাহারি একত্রে বসে সবার সম্মতি নিয়ে বিক্রি করতে হয়, আর মাহারির সবাই বিক্রির টাকা-পয়সা ভাগ পাবে, দিতে বাধ্য।

আমি ঘুরে দেখেছি, অনেক চালাক মারোওয়ারী বিহারী গারো মেয়েকে বিবাহ করে স্ত্রীর নামে জমি পাত্তা কিনে ব্যবসা করছে। কিন্তু নিয়ম কতদিন চলবে? কাশ্মিরেও কাশ্মিরবাসীদের জন্যে এরকম আলাদা নিয়ম ছিল। গত বছর সরকার সব নাগরিকের জন্যে সমান অধিকার করে দিয়ে দিয়েছে। যদি নিয়ম মেঘালয় রাজ্যে আসে তাহলে গারোরা কি পারবে নিজেদের সম্পদ রক্ষা করতে? নাকি জমি বিক্রি করে বিশটি ওয়াক মেরে ছেলে-মেয়েদের বিয়ে দেবে, জমি-জমা বিক্রি করে লক্ষ টাকা খরচ করে মিমাং কাম, জন্ম বাষির্কী পালন করবে? জানি না।

তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।

Post a Comment

0 Comments