গারো লোকগল্প | সালগ্রা মিৎদে | তর্পণ ঘাগ্রা | খু•রাং



জনজা। তার দুই স্ত্রী। এক জনের নাম আজি, অপর জনের নাম গিলজি। বলা হয় আগে গারো পুরুষ একের অধিক বিবাহ করতে পারত—জিকপাংমা, জিকগিদি, ও জিকব্রিং। প্রথম স্ত্রিকে বলে জিকপাংমা, দ্বিতীয়কে বলে জিকগিদি, তৃতীয়কে বলে জিকব্রিং। 

ইচ্ছে করলেই জিকগিদি নেওয়া যায় না, যখন সংসার বড় হবে, একজন স্ত্রী সংসারের কাজ করে শেষ করতে পারছে না, তখন স্ত্রীর ভাই মামারা কাজের মেয়েকে জিকগিদি হিসেবে বিয়ে করিয়ে দেবে। এই জিকগিদি সংসারে বৈধভাবেই থাকতে পারবে, কিন্তু, জিকব্রিংকে পরিবারে আনা যাবে না। জিকব্রিং অর্থ ‘জিক’ মানে স্ত্রী, আর ‘ব্রিং’ মানে জঙ্গল। তার মানে জিকব্রিংকে সবসময় জঙ্গলেই গোপনে রাখতে হয়। এই স্ত্রী জিকব্রিং কখনো বৈধ হবে না। 

জনজার বড় পরিবার। তাই তার স্ত্রীর ছোট বোন গিলজিকেই জিকগিদি হিসেবে চ্রারা দিয়েছে। দুই বোন নাকি অসম্ভব সুন্দরী। একদিন সালগ্রা মিৎদে, বাংলায় সূর্য দেবতা, জনজার বাড়িতে বেড়াতে এসে জনজার স্ত্রী আজি ও গিলজিকে দেখে ফেলে। তাদের রূপ সৌন্দর্য দেখে পাওয়ার জন্যে সালগ্রা মিৎদে পাগল হয়ে যায়। সালগ্রা জনজাকে সাব বলে দেয়, আগামি তিন দিন পর, ঠিক দুপুরে, তোমার দুই স্ত্রীকে জোর করে নিয়ে যেতে আসব। জনজাও ভয় পাওয়ার পাত্র নয়, কথায় কথায় বলে দেয়, আমিও এমনি ছেড়ে দেব না, শক্তিতে হেরে গেলে পরে বিবেচনা করব। 

সালগ্রা চলে যাওয়ার পর জনজা তার অস্ত্র মিল্লাম দাঁড়ালো করায় মনোযোগ দেয়। রীতিমতো যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি নেয়। দিন তারিখের দিন জনজা ঠিক দুপুর হওয়ার আগেই পাহাড়ি বাঁকা পথের আড়ালে ডান হাতে মিল্লাম নিয়ে সালগ্রাকে অপেক্ষা করতে থাকে। অনেক সময় অপেক্ষা করার পরও সালগ্রা তো আর আসে না। জনজা মনে মনে ভাবে হয়তো সালগ্রা মিৎদে ভয় পেয়েছে। ঠিক দুপুরের পরে, হঠাৎ পূর্ব দিকে ঝড় বাতাসের মতো শব্দ শুনা গেল। জনজা দেখে, আকাশে মেঘ নেই—কীসের ঝড় বাতাসের শব্দ আসছে! সে তার হাতের মিল্লাম শক্তভাবে ধরে অপেক্ষা করতে থাকে, শব্দ আস্তে আস্তে কাছে আসতে থাকে, জনজার মনোবল নড়বড়ে হয়ে যায়। শক্তি সঞ্চয় করে কোনরকম অপেক্ষা করে। হঠাৎ দেখে সামনে সালগ্রা। সালগ্রার মুখ এত আলো উজ্জ্বল- সেই আলোর জন্যে সালগ্রার মুখ সে দেখতে পাচ্ছিল না। জনজা প্রাণের ভয়ে মিল্লাম মাটিতে ফেলে, জীবন বাঁচাতে প্রাণপণ পালাতে থাকে। দূর থেকে মিৎদে সুসুমিমা আইমা দেখে জনজা দৌড়ে আসছে। সে সামনে গিয়ে থামায়, আর জিজ্ঞেস করে, জনজা তুমি পালাচ্ছো কেন? 
জনজা বলে, দেবতা সালগ্রা আমাকে মেরে আমার বৌদের নিতে আসছে, তাই প্রাণের ভয়ে পালাচ্ছি।
দেবী সুসুমি বলে, ভয় করো না। এত ভয় পাওয়ার কিছুই নেই। তুমি একটা কাজ করো এই ডিকগি মংএরা নিয়ে, যাওয়ার রাস্তায় ফেলে আসো। এই ডিকগির উপর বা কাছাকাছি সালগ্রার পা লাগলেই সে ঘুমিয়ে পড়বে, আর তোমার স্ত্রীদেরকে জোর করে নিতে পারবে না। 
জনজা বৌদের বাঁচাতে তাই করলো। সালগ্রা যেতে যেতে যেই ডিকগি মংএরার কাছাকাছি এলো তখনি তার চোখে ঘুম এসে গেল। এক সময় সালগ্রা মাটিতে শুয়ে গভীর ঘুমে ঢলে গেল। আর সালগ্রা ঘুমিয়ে পড়ার সাথে সাথে পৃথিবীর আলোও নিবে গেল। চারিদিকে অন্ধকার নেমে এলো। আর তো আলো আসে না, দিন হয় না। এদিকে দিনে বিচরণকারী পশু-পাখি মানুষের মহাবিপদ হয়ে গেল। এভাবে তো রাখা যাবে না। তাই দেবী সুসুমিমা আইমা ডিকগি মংএরা সরিয়ে নিয়ে দেবতা সালগ্রাকে ঘুম থেকে জাগায়। সাথে সাথে পৃথিবীতে আলো ফিরে আসে। আর সালগ্রাকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে তার নিজের বাড়িতে পাঠিয়ে দেয়, আর জনজার দুই স্ত্রী আজি গিলজিও রক্ষা পায়।
—তর্পণ ঘাগ্রা।

Post a Comment

0 Comments