সে এক বহুদিন আগের কথা। খুঁটিপাড়া গ্রামে বসবাস করতো এক সুখী দম্পতি মাদব ও সারা। তাদের ফুটফুটে নাদুস-নুদুস একটি ছেলে ছিল। ছেলেটির নাম খটেক। সে মা-বাবার নয়নের মনি। ছেলের এমন কোন আব্দার নেই যা মা-বাবা পূরণ করে নি। তাদের দিন অতি সুখে স্বচ্ছন্দে কেটে যাচ্ছিল।
একদিন রূপালী সন্ধায় বালকটি তার পিতা-মাতার সাথে বাড়ির উঠোনে বসে আছে। ঝিরিঝিরি বাতাস গায়ে লাগতেই এক ধরনের সুখ অনুভূত হচ্ছিল। সে-দিনের চাঁদ ছিল উজ্জ্বল এবং চাঁদের ছটায় আলোকময় ছিল তাদের উঠোন। তারাদের মাঝে সেই দূরের চাঁদটাকে মনে হচ্ছিল অপূর্ব সুন্দরী। বালক চাঁদের রূপ দেখে মুগ্ধ। চাঁদের দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্যে সে নাচতে শুরু করলো, গাইতে লাগলো। কিছুতেই যখন চাঁদকে ভোলাতে পারলো না, হঠাৎ স্থির হয়ে বাবার দিকে ঘুরে বললো… এ চাঁদ খুবই সুন্দর, দয়া করে তুমি তার কাছে যাও, তাকে আমার কথা বলো। তাকে তুমি নিয়ে আসো। আমি তার সাথে খেলতে চাই। বাবা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করলো, বললো, চাঁদ অনেক দূরে থাকে। আকাশে তার ঘর। তার কাছে যাওয়ার কোন রাস্তা নেই।

চাঁদের রূপে মুগ্ধ বালক কোন কথায় শুনতে চাইল না। চাঁদকে নিয়ে আসার জন্যে সে আব্দার করতেই থাকলো। বালকটি চাঁদের জন্যে এতই পাগল হয়ে গেল, তাকে না পাওয়া পর্যন্ত প্রায় কিছুই খেতে চাইল না। এভাবেই সময় চলে গেল, কয়েকটা দিন পার হলো। তার মা ছেলের অবস্থা দেখে উদ্বিগ্ন। স্বামীকে ডেকে বললো, ছেলের অবস্থা ক্রমেই খারাপের দিকে যাচ্ছে। চাঁদ এনে দিতে না পারলে ছেলেকে বাঁচানোই দায় হয়ে যাবে। তুমি বরং চেষ্টা করে দেখ, আকাশে যাওয়ার রাস্তা তৈরি করো, চাঁদকে নিয়ে আসো।
মাদব চেষ্টা করলো তার স্ত্রীকে বোঝাতে। বললো, কোনভাবেই সম্ভব নয় চাঁদের কাছে পৌঁছানো। কিন্তু তার স্ত্রী কোন কথাই শুনলো না। উপায় না দেখে অবশেষে সিদ্ধান্ত নিল, একটা মজবুত মই তৈরি করবে যা দিয়ে চাঁদে পৌঁছা সম্ভব। সে তার ভ্রাতুস্পুত্রকে ডেকে পাঠালো। তারা দু’জনে অনেক দূর-দূরান্ত থেকে যথেষ্ট বাঁশ সংগ্রহ করলো যা দিয়ে মই বানাতে পারে।
এবার তারা মই বানানো শুরু করলো যাতে চাঁদ পর্যন্ত যাওয়া যায়। শক্ত সমর্থ কয়েকটা বাঁশ মাটির যথেষ্ট গভীর পর্যন্ত পুতে নিল যাতে হেলে না যায়। পুরোদমে কাজ এগোচ্ছে। বাঁশের ঘাটতি পড়লে ভাতিজা বন থেকে বাঁশ সংগ্রহ করে আর মাধব মই বানায়। এভাবেই আস্তে আস্তে মই লম্বা হতে থাকে। দেখতে দেখতে মই চাঁদের কাছাকাছি পৌঁছে যায়, মেঘ ভেদ করে আরো উঁচুতে পৌঁছে গেল। মাধবের অনন্দ ধরে না। ভাবলো, চাঁদ আর বেশি দূরে না। ভাতিজাকে ডেকে বললো, আমাকে আরো কিছু বাঁশ দাও, আর কয়েকটা বাঁশ হলেই চাঁদ পর্যন্ত পৌঁছা যাবে।
নিচে দাঁড়ানো স্ত্রী ও ভাতিজা দূরত্বের কারণে তার কথা ঠিকমতো শুনতে পারলো না। তারা ভাবলো, সে বলছে ‘আমি চাঁদে পৌঁছে গেছি, মই সরিয়ে নাও।’ ভাতিজা একটা কুঠার নিয়ে আসলো এবং বাঁশ কাটা শুরু করলো। কিছুক্ষণের ভেতর প্রচণ্ড শব্দ করে আকাশ থেকে মই ভেঙ্গে নিচে পড়লো। দুঃখের বিষয়, মাধব নিচে পড়ে গেল আর মাটিতে পড়ে কিছুক্ষণের মধ্যে মারা গেল।
মাধবের স্ত্রী আর ভাতিজা তার পড়ে যাওয়া বিষয়ে কিছুই জানতে পারলো না। তার জন্য তারা দীর্ঘদিন অপেক্ষা করে থাকলো কারণ তারা জানে না মাধব মারা গেছে। তারা এখনো বিশ্বাস করে সে ছেলের জন্যে চাঁদ নিয়ে অবশ্যই একদিন ফিরে আসবে।
তারপরও আকাশে চাঁদ দেখা যায়, নিয়ম করে চাঁদ উঠে। এখন তারা বিশ্বাস করে, মাধব চাঁদের প্রেমে পড়েছে এবং চাঁদের সাথে থেকে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এখন তারা সুখে সংসার করছে।
এদিকে, যে বিরাট মই মাটিতে ভেঙ্গে পড়লো, তা ভেঙ্গে টুকরো টুকরো হয়ে বিশাল পাহাড় তৈরি হলো। গারো জনগোষ্ঠীর লোকেরা এ পাহাড়কে ডাকে ‘জাজং গাডুরাম’ যার অর্থ ‘চাঁদের মই’। এটাই গারো পাহাড়ের বড় অংশ।
এখনও তুমি যদি নীরবে কান পেতে শুনো, জাজং গাডুরামে শুনতে পাবে মাধবের গোঙানি যা মাটিতে পড়ে যাওয়ার পর তার গলা থেকে বের হচ্ছিল।
0 Comments