সাংসারেক গারোদের সবচেয়ে বড় উৎসবের নাম ওয়ানগালা। এ ওয়ানগালা অনুষ্ঠানে মিৎদে মিসি সালজং বা সূর্য দেবতাকে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেয়। মিসি সালজংকে নতুন ধান ফল-ফলান্তি ভোগ না দিয়ে সাংসারেক গারোরা নতুন ধান, নতুন ফল-ফলান্তি মুখে দেবে না, খাবে না, এটাই তাদের নিয়ম। ওয়ানগালা বা নবান্ন অনুষ্ঠানকে ওয়ানগালা নাম দেওয়া হলো কেন তাও ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে- আবেং গোত্র বলে মানথি, আচিক গোত্র বলে ওয়ানথি, বাংলায় পিঠা। অনুষ্ঠান বা পর্বের সময় ওয়ানথি পুরা, বাংলায় চাউলের গুড়ো- পানিতে গুলিয়ে, সাদা বানিয়ে, প্রত্যেক লোকের কপালে গালে হাতে মাখানো হয়, এটাকে সাংসারেক গারোরা ওয়ানথি থকগা বলে। এ ওয়ানথি পুরা থকগা থেকে ওয়ান্না নাম আসছে, আর গালা অর্থ ফেলে দেওয়া। এ ওয়ানগালা বা নবান্ন অনুষ্ঠান একদিনে হয় না সেটা নির্ভর করে গ্রামের ধনী পরিবারের উপর। চারটি ধনী পরিবার থাকলে প্রথমে চারদিন প্রত্যেক পরিবারে পর্ব হবে, এটাকে বলা হয় ‘ওয়ান্না চাআ’। শেষ দিনে নকমার বাড়িতে বড় ধরনের অনুষ্ঠান হয়, সেটাকে বলে ‘ওয়ানগালা’, শেষ করে দেওয়া বা ফেলে দেওয়া।

এ ওয়ানগালা বা মিৎদে সালজং বা সূর্য দেবতাকে এত বড় করে পালন করে কেন? এ দেবতাই সাংসারেক গারোদের বেশি উপকার করেছে। রোদ না হলে ধান ভাল হবে না, রোদে ধান শুকাতে না পারলে চাউল হবে না, জ্বালানি কাঠ রৌদ্রে না শুকালে আগুন জ্বলবে না আরো অনেক। এ কারণে মিৎদে সালজং বা সূর্য দেবতাকে সাংসারেক গারোরা সবচেয়ে বেশি বড় করে অনুষ্ঠান করে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেয় এবং প্রতি বছর অক্টোবর মাসে পালন করে।

সাংসারেক গারোরা দিন তারিখ গণনা করতে পারে না, কেলেন্ডার তাদের কাছে নেই, হয়ত সেই সময় কেলেন্ডার আবিষ্কার হয় নি। তারা মিগং গাছের ফুল দেখে ওয়ানগালার কার্যক্রম শুরু করে দিত। ওয়ান্না চাআ বা ওয়ানগালা বা নবান্ন অনুষ্ঠানে শুধু দয়ার মিৎদে মিসি সালজংয়ের আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়াই নয় সেখানে আনন্দের অনেক অনুষ্ঠান করা হয়। এক দুই ঘন্টা আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়া হয়, পরে সারাদিন অর্ধেক রাত পর্যন্ত চলে নাচ, গান। নাচের মধ্যে বাজনার তালে তালে ঘোরে রওয়া, দওক্রো মি সুআ, চামি সেকগা, দেল্লাং গাকিমিৎদা আরো অনেক। আর গানের মধ্যে রেরে গান, আজিয়া গান, খাবি গান, ধরওয়া গান, গন্ডা দকগা গান, এরকম আরো অনেক। এ গান মহিলা-পুরুষ যুবক-যুবতীদের মধ্যে প্রতিযোগিতার মতো হয়। বীর পুরুষদের আরেকটি বিশেষ অনুষ্ঠান আছে গ্রিকগা মেশাআ, মাৎগ্রিক বা বীরেরা মিল্লাম বা তলোয়ার আরো সিপপি বা ঢাল নিয়ে যুদ্ধের ঢংয়ে নাচতে থাকে, একজনের পর আরেকজন একই ঢংয়ে নাচে। এ নাচকে গারোরা গ্রিকগা মেশাআ বলে, এ নাচের আগে প্রত্যেক বীরেরা শুরুতেই মিল্লাম উঁচিয়ে চিৎকার বা হুংকার দিয়ে গারো ভাষায় ছন্দ মিলিয়ে কথা বলে, তাই এ নাচের মজা আলাদা।

গারো সাংসারেক ধর্মে আত্মার মুক্তির ব্যাপারে ভাল কাহিনী শুনি নি, হয়ত থাকতেও পারে। তবে ভাল কাজের পুরস্কার, খারাপ কাজের শাস্তি, এটা পাওয়া যায়। খারাপ কাজ করে আত্মার ভাল জায়গায় থাকার কোন সুযোগ নেই। যদি আপনি কারো কাছ থেকে টাকা বা ধান চাউল লোন নিয়ে, পরিশোধ না করেই মারা যান, তখন আত্মা সেই বাড়িতে কুকুর হয়ে পুনর্জন্ম নিয়ে ঘর পাহাড়া দিয়ে লোন শোধ করবে। অথবা গরীবের ঘরে পুনর্জন্ম নিয়ে তার বাড়িতে চাকর কেটে বা গরু হয়ে জন্ম নিয়ে হাল চাষ করে তার লোন শোধ করতে হবে। জীবিত থাকতে ক্ষমা না চাইলে আত্মার কোন মাফ ক্ষমা নেই। জীবিত থাকাকালীন ভাল কাজ করলে, অন্যকে সাহায্য সহযোগিতা করলে, অসুস্থকে সেবা দিলে, ক্ষুধার্তকে খাবার দিলে, যাদের কাপড় নেই তাদেরকে কাপড় দিলে, মরার পর আত্মা কোন ধনী পরিবারে পুনর্জন্ম হয়ে আরাম আয়েশে দিন কাটাবে। অথবা ভাল ফলবান গাছ হয়ে জন্ম নিয়ে আজীবন সুমিষ্ট ফল দিয়ে মানুষ পশু-পাখিদের খাবার যোগাবে, আর মানুষ খুশি হয়ে গাছের গুড়ায় পানি দেবে, সার দেবে, আরামে থাকা যাবে ইত্যাদি।

খ্রিস্ট ধর্ম বা বর্তমান অন্যান্য ধর্মেও আত্মার মুক্তি পাওয়া সহজ নয়। আত্মার মুক্তি দিতে শরীর মন সব কিছুকেই কঠোর নিয়মের মধ্যে থাকতে হয়। যতদিন বেঁচে আছি ততদিন ভাল কাজ করতে হবে, গরীব দুঃখিদের সাহায্য করতে হবে, রাগ হিংসা খারাপ মনোভাব চিরতরে বিদায় দিতে হবে, তবেই মরে গেলে আত্মার মুক্তি আসবে। এ মায়ায় ভরা, প্রলোভনে ভরপুর পৃথিবীতে আত্মার মুক্তি ডাল ভাতের মতো এত সহজ নয়। কঠোর সাধনা ত্যাগের ব্যাপার-স্যাপারকে কতটুকু নিজের আত্মা মুক্তি দিতে পারবে জানা কঠিন। সাংসারেক গারোদের বিশ্বাসের ফসল মিৎদে শয়তান যাই বলি না কেন এগুলো কিন্তু গারো জাতীর আসল সংস্কৃতি ছিল, তাদের পালনীয় স্বরণীয় ব্যবহার্য সবকিছু লিখে রাখতে পারলে বিরাট বড় গারো সাহিত্য কাব্য হয়ে যেত। কবি মাইকেল মধুসুদন দত্তের লেখা মেঘনাথ বধ কাব্য পড়ে দেখুন সেখানে হিন্দুদের ধর্মীয় গ্রন্থ রামায়ণের কাহিনী থেকে কাব্য আকারে লেখা হয়েছে। এখন বিখ্যাত বড় কাব্য হয়ে আছে। রোমান জাতির সংস্কৃতি পড়ে দেখুন, তাদের সবচেয়ে বড় দেবতার নাম সূর্য দেবতা। খ্রিস্টান হওয়ার আগে রোমানরা পঁচিশে ডিসেম্বর সূর্য দেবতাকে আনুষ্ঠানিকভাবে বড় আকারে পালন করত। খ্রিস্টান হওয়ার পর রোম সম্রাট পঁচিশে ডিসেম্বরে সূর্য দেবতার পরিবর্তে যীশু খ্রিস্টের জন্ম দিবস পালন করার নির্দেশ দেয়, রোমান সভ্যতা রোমান সংস্কৃতি বলতে সেই দেব-দেবীকেই বোঝায়। তারা লিখে রেখে গেছে বলেই আজ রোমানদের সংস্কৃতি ইতিহাস পড়ে মানুষ মুগ্ধ হয়, বাহ্বা দেয়, রোমানদের সংস্কৃতি কত উন্নত বলে। গ্রীক সংস্কৃতিতেও অনেক দেব-দেবীর কাহিনী দেখা যায়- প্রেমের দেবী আফ্রোদিতি, এভাবে শক্তি দেবতা, জ্ঞানের দেবতা, রক্ষাকারী দেবতা, লালন-পালনকারী দেবতা, এরকম আরো অনেক কিছু লেখা আছে। এগুলো গ্রীক জাতিদের প্রাচীন সাহিত্য কাব্য ইতিহাস সংস্কৃতি জাতিগত পরিচয়। তাদের এ সংস্কৃতি বই আকারে লিখে না রাখলে কে জানতো তাদের এ সভ্যতার কথা। সাংসারেক গারোদেরও আছে শক্তির মিৎদে বা দেবতা গয়রা, লালন-পালনের দেবতা সালজং, শাস্তি দেওয়ার দেবী সুসুমি, আত্মার দেবতা ওয়াইমং, সৃষ্টিকর্তা বা ঈশ্বর দেবতাদের দেবতা তাতারা রাবুগা, এরকম অনেক দেবতার নাম লেখা যায়। হাজার হাজার বছর আগে অথবা তারও আগে থেকে সাংসারেক গারোরা বিশাল বড় সংস্কৃতি বুকে আগলিয়ে ধরে লালন-পালন করে এসেছিল, তা আমরা একশত বছরের মধ্যেই নিজের হাতে সব শেষ করেছি, ধ্বংস করে দিয়েছি। বর্তমানে শিক্ষিত হওয়ার পরেও গারো দামা বা ঢোলকে বলে শয়তানের ঢোল।
0 Comments