বান্দরবান শহর থেকে প্রায় ৪৭ কিলোমিটার দুরুত্বে চিম্বুক পাহাড়ের কুলে ম্রো জনগোষ্ঠীর বসবাস। এখানে তাদের অনেকগুলো গ্রাম, বাড়ি, সংসার ও মানুষ। আর এই মানুষদের জীবন-জীবিকা, স্বপ্ন, অস্তিত্ব সব এই পাহাড়ে। শত বছরের সম্পর্ক এই মানুষ ও পাহাড়ের। মা যেমন সন্তানকে কুলে আকড়ে ধরে রাখে, পাহাড়ের কুলে ম্রো জনগোষ্ঠীরাও তেমন। এখানে প্রতিটা গাছ তাদের খেলার সাথি, রৌদ বৃষ্টিতে ভাইয়ের ছায়া।
এই পাহাড় ও মানুষদের নিয়ে রাষ্ট্র খুব চিন্তিত। তাও হঠাৎ। সংবাদপত্রের পাতায়, টেলিভিশন চ্যানেলে, সামাজিক মাধ্যমে বেশ আলোচনা। মনে হতে পারে সুনজর পড়েছে পাহাড়ের এই অবহেলিত জনগোষ্ঠীর ওপর। এবার এখানে স্কুল হবে। স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স হবে। পাকা রাস্তা হবে। ঘরে ঘরে বিদ্যুৎ আসবে। বলতে পারেন সবার জন্য শিক্ষা, সবার জন্য কাজ হবে। কিন্তু হতাশা নিয়ে দেখছি, ঠিক এমনটা হচ্ছে না।
চিম্বুক পাহাড়ের কুলে পাচঁতারা হোটেল হবে। বানাবে দেশের এক প্রভাবশালী গ্রুপ অফ কোম্পানী। সহায়তায় রাষ্ট্রের সরকার, এবং বাহিনী। বাহিনী বললে বা বলতে আসলে অস্পষ্ট ধারণা হয়, তবে এই রাষ্ট্রের সচেতন প্রতিটা মানুষ জানে পাহাড়ে বাহিনী কাদের বলা হয়। কোটি কোটি টাকার বাজেট। বিশাল অট্টালিকা ভবন হবে। বিশাল জায়গা দরকার হবে। তাই এই পাহাড়ে বংশানুক্রমে বসবাস করে আসা ম্রো জনগোষ্ঠীদের জায়গা ছেড়ে দিতে হবে। না! আলাপ-আলোচনা করার দরকার অনুভব করছে না। সরাসরি উচ্ছেদ। তাহলে এই শত শত পরিবার, হাজার হাজার মানুষ যাবে কোথায়। সেটা দেখার, বা, তাদের কথা শুনার ইচ্ছে রাষ্ট্রের নাই বলেই মনে হচ্ছে।

ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ বাড়ি ছেড়ে ইতোমধ্যে রাস্তায় নেমে এসেছে। না! এখনও পুরোপুরি উচ্ছেদ হয় নি। জমি-বাড়ি-পরিবার রক্ষায় আকুতি-মিনতি নিয়ে রাষ্ট্রের কাছে দাবি তুলছে। রাষ্ট্র শুনবে কিনা, জানি না। তবে রাষ্ট্রের মানুষ শুনেছে, দেখেছে, প্রতিবাদ জানিয়েছে। দেশের অনেক জায়গায় মানববন্ধন হয়েছে। ছাত্র-জনতা-পেশাজীবি মানুষ ম্রো জনগোষ্ঠীর জন্য কথা বলছে। ঢাকায় প্রেসক্লাবে, শাহবাগে যাদুঘরের সামনে একাধিক সমাবেশ হয়েছে। জলবায়ু পরিবর্তন নিয়ে কাজ করা অনেক সংগঠন বলছে যে সহজ কথা পাহাড় গাছ কেটে দেশের অবস্থা আরও খারাপ হবে।
কোটি টাকার বাজেট, কোটি ডলার আয়ের স্বপ্ন। হাজার মানুষের কথায় তো আর পিছপা হচ্ছে না গ্রুপ অফ কোম্পানী। শেষ লড়াই তারাও লড়বে। আধিপত্য কায়েমের প্রথম কৌশল বিভেদ তৈরি। হ্যাঁ, বিভেদ। পাহাড়ি ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষের সাথে সেখানে বসবাস করা বাঙ্গালী জনগোষ্ঠীর মানুষের। উন্নয়নে লাড্ডু। হোটেল হলে কাজের সুযোগ হবে। টাকা পাবে। আরও ভাল থাকবে। উন্নয়ন লাড্ডু খেলে খাবি। লাড্ডু না হলে গুলি খাবি। হিসাব এখানে আরও খুব সহজ।
শত শত পরিবার এবং হাজার হাজার ম্রো জনগোষ্ঠীর জীবন-জীবিকা আজ অস্তিত্বের সংকটে। শেষ রক্ষা হবে কিনা, জানি না। যদি দেশের প্রতিটা পরিবার, প্রতিটা মানুষ এই ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষদের আপন মনে করে, ভাই আত্নীয় মনে করে, তাদের এই বিপদের দিনে পাশে দাঁড়ায়, কথা বলে, লিখে, আওয়াজ তুলে, তাহলে হয়ত ভাঙ্গবে না শতশত ম্রো পরিবার; উচ্ছেদ হবে না হাজার হাজার ম্রো জনগোষ্ঠীর মানুষ। যারা আমাদের ভাই আত্মীয়।
0 Comments