জানুয়ারিতে শান্তি জীবন চাকমা নামের এক দাদার সাথে পরিচয় হয়েছিল। উনার সাথে বেশ ক’বার আলাপও হয়েছিল। তিনি বলেছিলেন, এবার বাড়িতে গেলে আপনাকে সাথে করে নিয়ে যাব। গরীবের ঘরে কিছুদিন থেকে সাজেকের খাঁড়া উঁচু পাহাড় দেখবেন, আকাশের নীল দেখবেন, আর দেখবেন সাদা মেঘের ভেলা—কেমন করে মেঘ ও পাহাড় একাকার হয়ে আছে! মনে হবে, সিনেমায় দেখা কোন পরীর দেশ। চারিদিকে মেঘ উড়ে এসে পাহাড়ের গায়ে লেগে সরে যাচ্ছে।
এসব দেখার অদম্য ইচ্ছে তখন আমার ভেতরকে তুমুল আন্দোলিত করছিল। আমি ভাবছিলাম আর বলছিলাম, যাব, অবশ্যই যাব! আর জিজ্ঞেস করছিলাম, এতদূর থেকে এখানে এসে কাজ করছেন, আপনার ভাল লাগে? বলছিলেন, উনার একটা মেয়ে আছে, এবার এসএসসি পরীক্ষা দেবে। কাজ না করলে মেয়েটাকে পড়াবো কিভাবে? আমাদের এখানে, আশেপাশে স্কুল কলেজ নেই। দূরে, হোস্টেলে রেখে পড়াতে হয়। অনেক খরচ।
এরও কিছুদিন আগে মাটিরাঙার ‘অং কে চিং মারমা’ ও ‘সা তুইঙং মারমা’র সাথেও আলাপ হয়েছিল। তারাও বলেছিল, এবার বৈসাবিতে তাদের ওখানে নিয়ে যাবে। আমি বলেছিলাম, আমি কোনদিন রাঙামাটি, বান্দরবান, খাগড়াছড়ি যাই নি। বৈসাবি দেখি নি। শুনেছি, পার্বত্য এলাকা খুব সুন্দর। অনেক উঁচু পাহাড় আর সেই উঁচু পাহাড় বেয়ে আঁকাবাঁকা পথ। বাস একবার খাঁড়া ওপরে ওঠে তো একবার খাঁড়া নিচে নামে। যারা এখান থেকে যায়, তারা বলে, নিমেষে কলিজার পানি শুকিয়ে যায়। বুক ধরফর করে। আঁকাবাঁকা পথ পাড়ি দেওয়ার সময় নিচে থাকালে মনে হয়, হায়! কি দেখলাম! মাথা চক্কর দিয়ে ওঠে। বাস একবার খাদে পড়ে গেলে ধ্বংসাবশেষও খুঁজে পাওয়া যাবে না।
এ দু’জনের ‘সা তুইঙং’ মাটিরাঙা কলেজে ডিগ্রিতে পড়ে। পরীক্ষার সময় পরীক্ষা দিতে যায়। তখন তাকে মাটিরাঙায় ঘর ভাড়া করে থাকতে হয়। তাদের বাড়ি থেকে মাটিরাঙায় আসাটা খুব মুশকিল। আর বাকি সময় গাজীপুরের গার্মেন্টসগুলোতে সে কাজ করে। তাদের এলাকার অনেকেই এভাবে এগিয়ে যাচ্ছে। পড়াশুনা করছে।
২.
ওইদিকে নসীব খারাপ হলে যা হয়—করোনার কারণে আমার সাজেক যাওয়া হয় নি, বৈসাবিও দেখা হয় নি। চাকমা মারমা গ্রামও ঘোরা হয় নি। তাদের কাছে প্রায়শই শুনতাম পাহাড়ে এই হচ্ছে, ওই হচ্ছে। পাহাড় ভাল নেই। পাহাড়ের মানুষ ভাল নেই। তাদেরকে ভাল থাকতে দেওয়া হচ্ছে না। ভাল থাকার সব উপাদান কেড়ে নেওয়া হচ্ছে। শাসকেরা, শোষকেরা, শাসকের গুন্ডাবাহিনীরা কৌশলে সেটেলার ও জুম্মবাসীদের মধ্যে দূরত্ব তৈরি করে রেখেছে। কিছু হলেই স্বার্থান্বেষী মহল (স্থানীয় রাজনৈতিক নেতা) ও শাসকগোষ্ঠীদের প্রত্যক্ষ মদদে সেটেলাররা জুম্মদের জানমালের ক্ষতি করে, হামলা করে। যখন তারা নিজেরাও শুনে পাহাড়ে কিছু হচ্ছে, তখন বাড়িতে যাওয়ার হলেও, ছুটি হলেও, তারাও এখান থেকে বাড়িতে যায় না। পথিমধ্যে বিপদের সমূহ আশঙ্কা থাকে, ঘটে।

আর এখন হঠাৎই সেখানে শুরু হয়েছে চিম্বুক পাহাড় থেকে ম্রো জনগোষ্ঠীদের হটিয়ে, তাদের জায়গা জমি বসতভিটা দখল করে, তাদের নাম নিশানা মুছে, বংশ পরম্পরার ভূমিজ ঐতিহ্য মুছে, শুধুমাত্র ব্যবসায়ীক স্বার্থে, মুনাফার স্বার্থে সেখানে একটি পাঁচতারা হোটেল করবে। আর এ অমানবিক কাজে জয়েন্ট ভ্যানচারে শামিল হয়েছে সিকদার গ্রুপ ও সেনাবাহিনী। এর মধ্যে ভূমি দখল থেকে পাহাড় কাটা, ম্রো পাড়ার বিভিন্ন জায়গায় সিকদার গ্রুপের লোগো লাগানো পিলার বসানো সহ ম্রো জনগোষ্ঠী ও স্থানীয়দের সেসব জায়গায় যেতে বাঁধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ যাদের জমি, যারা জমির মালিক সেই ম্রো জনগোষ্ঠীরা এ নিয়ে কিছুই জানে না।

দেশের পয়সাওয়ালারা সেখানে গিয়ে আমোদ করবে, ফুর্তি করবে, মদ গিলবে, সেলফি তুলে সোশ্যাল মিডিয়ায় দিবে, লাইভ ভিডিও শেয়ার করে মজা নিবে। আর ম্রো জনগোষ্ঠীরা তাদের বংশ পরম্পরার সহায় সম্বল ঐহিত্য ভূমি হারিয়ে ক্ষোভে দুঃখে এই নিষ্ঠুর অন্যায় আচরণ মেনে নেবে? সারা দেশের বিবেকবান মানুষ, ন্যায়ের পক্ষের মানুষ, মানবতার পক্ষের মানুষ সরব হলেও একপেশে দুঃশাসনই যাদের ক্ষমতার উৎস সেই শাসক শোষকেরা কি মানুষের কথা শুনবে? মানুষের কথা তাদের কানে পৌঁছোবে? অন্যের ক্ষতি করে ধ্বংস করে চিরকাল যারা খুশি হয়, খুশি হয়ে এসেছে তারা কি তাদের পাশবিক মানসিকতায় পরিবর্তন আনবে, ক্ষান্ত হবে? শেষতক মানুষের পক্ষে দাঁড়াবে? ম্রোদের পক্ষ নেবে?
পাহাড়ে শোষকদের হঠাৎ এই দখলদারিত্বের আগ্রাসনে ম্রো জনগোষ্ঠীরা চরম বিপদে, তাদের অস্তিত্ব আজ মহা-সংকটে। আসুন তাদের পক্ষ নিই। তাদের পক্ষে দাঁড়ায়।
0 Comments