মিৎদে বালওয়া বালপ্রং, বাংলায় বাতাস দেবতা। এ বাতাস দেবতাও সাংসারেক গারোদের মিৎদে, বা, দেবতাদের মধ্যে একটি দেবতা। এখনও মিৎদে বালওয়া বালপ্রং বা বাতাস দেবতা আছে। সাংসারেক ধর্মের সাথে শেষ হয়ে যায় নি। এ বাতাসে কোন মিৎদে শয়তান বা শয়তানামী দেখি না, তবে এখনও গারোরা বলে, রামানি মানসাপা। আর বাঙালিরা বলে, বাতাস লেগেছে। অসুস্থ বানিয়েছে।
সাংসারেক কামালেরা বলে, মাঝে মাঝে রাস্তার পাশের ঔষধি গাছে ফুল ফোটে গন্ধ ছড়ায়, ঔষধি গাছের দেহের গন্ধ বাতাসের সাথে মিশে যায়, সেই বাতাস নিঃশ্বাস নিলে মানুষ অসুস্থ হয়ে যায়। এই অসুস্থতাকে গারোরা বলে রামানি মানসাপা বা সাম বালনাংআ। বাংলায় ফুলের বা গাছের গন্ধে অসুস্থ হওয়া। তখন গারোরা সেই গাছের পাতা বা শেকড় গুড়ো করে অল্প খাওয়ায় ও শরীরে মালিশ করে। তখনি অসুখ সেড়ে যায়। গারোরা আর একটি ঔষধি গাছ ব্যবহার করে, হলুদ গাছের পাতার মতো, মাটির নিচেও হলুদের মতো আলু হয়, প্রায় রাস্তার পাশে এ গাছ পাওয়া যায়, এ গাছের আলু অল্প খাওয়ালে রোগী ভাল হয়ে যায়। এখন বুঝে নিন সাংসারেক গারোদের মিৎদে বালওয়া বালপ্রং বা বাতাস দেবতার শক্তি কত, কিভাবে মিৎদে শয়তান শয়তানী করে, মানুষকে কামর দেয়, সুস্থ মানুষকে অসুস্থ বানায়। আসল ঘটনা কি তা আমরা জানতে চেষ্টা করি না, তলিয়েও দেখি না, অন্যভাবে ঘুরিয়ে সাংসারেক গারোদের নির্দোষ মিৎদে বা দেবতাকে মিৎদে শয়তান শয়তানী করে বলে চালিয়ে দিই। খ্রিস্টান গারোরা এভাবেই জেনে এসেছে, এখনও এভাবেই জানে। অনেক শিক্ষিত হয়েও কেউ খুঁজে দেখে নি। সাংসারেক গারোদের দেবতাকে মিৎদে শয়তান বলেই মনে ধারণ করে আছে।
![]() |
| তর্পণ ঘাগ্রা |
আর একটি মিৎদের কথা লিখি। আসং মিৎদে, এখানে আসং মিৎদের ব্যাখ্যাও দিচ্ছি। আ + সং = আসং। আ মানে আ.আ, বাংলায় মাটি। আর সং মানে সংআদাম, বাংলায় গ্রাম এলাকা। আসং মিৎদে মানে গ্রামের দেবতা। সহজ ভাষায় মাটির দেবতা। বাংলাদেশে সাংসারেক গারো আর নেই, কিন্তু, তাদের আসং মিৎদে বা মাটির দেবতা শেষ হয়ে যায় নি। এখনও আমরা মাটির উপর হেঁটে বেড়াই, ফসল ও ফল-ফলান্তির গাছ লাগায়। কোথায় মিৎদে শয়তান খুঁজে পাই না। সাংসারেক গারোদের সময় আসং মিৎদে বা মাটির দেবতা শয়তানী করলে এখন আরও বেশি করত, কারণ মিৎদে বা দেবতাদের আর ভোগ খাবার দেওয়া হয় না। সামবা সিয়া বা আসন তৈরি করে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়া হয় না। মিৎদে বা দেবতারা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে মানুষকে নষ্ট করত, হত্যা করত। এখন আগের চেয়ে অনেক মানুষ হয়ে গেছে, যেখানে সেখানে মানুষ পাওয়া যায়। আগে সাংসারেক গারোদের সময় আসং মিৎদে বা মাটির দেবতা অশান্ত ছিল মনে হয়, এখন শান্ত হয়ে গেছে, রাগ করে না, মেজাজ দেখায় না, মানুষ মেরে ফেলে না।
পুজারি বা কামাল আসং মিৎদে বা মাটির দেবতাকে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়ার সময় যে কথাগুলো মিংআ চংআ বা মন্ত্র পাঠ করেছে তাও নিচে দিলাম শয়তানী খুঁজে দেখুন।
গারো ভাষায়—
ওয়ে আসং মিৎদে চিংনি আমা
ইাংনি খাবাকন চিংআ থাংআনে।
নাআন দংনা বিয়াপ অননানে
মিমা মিসি মিসু সামবিজাকরাং।
নাংওন চাদেংআ আরো দাল্লানে
মিমা মিসি আরো গিপবিন বিথেরাংনি।
মিননাকো চা.এ রিংএসা
সাংসারেক গারোরাং থাংয়ে দংআনে।
বাংলা ভাষায়—
ও মাটির দেবতা আমাদের মা
তোমার কুলে আমরা বসবাস করি।
তুমি থাকতে জায়গা দিয়েছ
আন অন্যান্য ফসলও দাঁড়িয়ে থাকে।
তোমার রস খায় বড় হয়
ফসলের ফলগুলো পাকে।
সেই ফল পেরে খেয়ে
সাংসারেক গারোরা বেঁচে থাকে।
অনেক লম্বা মন্ত্র, শুধু জানার জন্যে অল্প লিখলাম। এ মন্ত্র পড়লে, শুনলে, মনে হবে মা মাটির পৃথিবী তার কুলে আমাদের থাকতে দেয়, তার উপর ফসল ফলিয়ে খেয়ে মানুষ বেঁচে থাকে। সাংসারেক গারোদের জন্যে এ আসং মিৎদে বা মাটির দেবতা এত উপকার করেছে, তাই তারা বছরে একবার উপকারের কথা স্মরণ করে ধন্যবাদের অনুষ্ঠান করে থাকে। সাংসারেক গারোরা নাম দিয়েছে আসং মিৎদে বা মাটির দেবতার আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়া। আসলে সাংসারেক গারোরা জানে না আত্মার মুক্তি কিভাবে হয়, কাকে মানলে অনন্ত মুক্তি বা স্বর্গ লাভ করা যায়, কিন্তু তারা এ পৃথিবীতে যাদের কাছ থেকে বেশি উপকার পেয়েছে তাদেরকে ভুলে যায় নি, নাম দিয়ে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়া শুরু করে। এভাবেই মিৎদে বা দেবতাদের সৃষ্টি হয়। মিৎদে মানে আসলেই দেবতা, পরে খ্রিস্টান হওয়ার পর খ্রিস্টান গারোরা মিৎদের সাথে নতুন নাম শয়তান যোগ দেয়, পরে পুরো নাম হয়ে যায় মিৎদে শয়তান। শয়তান শব্দটি গারো ভাষার শব্দ নয়, শব্দটি বাংলা ভাষা থেকে এসেছে। গারো ভাষায় ঢুকেছে। সাংসারেক গারোদের কাছ থেকে শয়তান শব্দ আসে নি, আসবেই বা কেন, নিজের পালনীয় মিৎদে বা দেবতাকে তো শয়তান বলা যায় না।
তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।


0 Comments