মিৎদে শয়তান- দ্বিতীয় পর্ব ‖ তর্পণ ঘাগ্রা ‖ খু•রাং

একদিন শীতকালে গাজিরভিটার সাংসারেক গারোরা মিৎদে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়ার ব্যবস্থা করে। আমাকেও খবর দেয়। আমি একদিন আগেই ছোট টেপ রেকর্ডার নিয়ে উপস্থিত থাকি। তারা একজন অসুস্থ বৃদ্ধা মহিলাকে সুস্থ করে তোলার জন্যে মিৎদে সালজং, মিৎদে সুসুমি, মিৎদে চুড়া বোধি এই তিন মিৎদে বা দেবতার ‘সামবা সিয়া’ বা আসন তৈরি করে পুজোর ব্যবস্থা করে। প্রথমে মাঝারি খাসি শুকর মারে। শুকরের রক্ত ও কিছু খাবার ‘সামবা সিয়া’র সামনে ভোগ দেয়। রক্ত ছিটিয়ে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়া শুরু করে। প্রচুর মানুষ চারিদিকে দেখে। কামাল বা পুরোহিত যখন মিংআ চংআ বা মন্ত্র পড়া শুরু করে আমি কামালের সাথে বসে রেকর্ড করি, আর কি বলে মনোযোগ দিয়ে শুনি। কামাল অন্যদেরকে কাছে আসতে দেয় না। সামবা সিয়া বা আসনের কাছে কামাল বা পুরোহিত, আমি, আর সহকারি কামাল বা পুরোহিত থাকে। তারা সহকারি কামালের নাম দিয়েছে রানগিবা। সেই-ই কামালের আনুষঙ্গিক জিনিসপত্র যোগার করে দেয়। মিৎদে সালজংয়ের পুজো শেষ করার পর আসে মিৎদে সুসুমির আসনের সামনে। আগের মতো কলাপাতায় কিছু ভোগ দিয়ে শুরু করে। তিনটি বড় বড় লাল মোরগ মারে। রক্ত ছিটিয়ে মন্ত্র পড়ে।

একদিন আগেই পুজো দেওয়ার জন্যে শুকর মোরগ পাঠাকে আনুষ্ঠানিকভাবে গোসল করায়, শরীরের ময়লা পরিষ্কার করে পাক পবিত্র করে তুলে, খাবার দিয়ে সারারাত পরিষ্কার জায়গায় বেঁধে রাখে। শেষে আসে মিৎদে চুড়া বোধির পুজো। চুড়া বোধির আসন অন্যরকম। ঠিক গরুকে খড় খাওয়ানোর গোল ছাড়ির মতো। মাঝারি কালো পাঠা দিয়ে পুজো দিতে হয়। এখানে একটি অদ্ভুত অবস্থা দেখলাম, পাঠা মারার আগে সামবা সিয়া বা আসনের চারিদিকে পাঠাকে নিয়ে সাত পাক ঘুরাতে হয়। সহকারি কামাল বা পুরোহিত পাঠার গলায় দড়ি বেঁধে নিজের কাঁধে মিল্লাম বা ধারালো অস্ত্র নেয়। সহকারি কামাল পাঠাকে নিয়ে আসনের এক পাক ঘুরে আসলে ছোট লাঠি দিয়ে পাঠার পিঠে আস্তে করে মেরে বলে পয়শা। এভাবে সাত পাক ঘুরে সাতবার মারে আর সাতবার পয়সিনি বলে শেষ করে। তারপর রানগিবা পাঠার গলার দড়ি খুলে দেয়, পাঠা ছোট আসনের সামনে গিয়ে গলা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকে। কামাল বা পুজারি বলে, দেখ, দেখ, বাবু! মিৎদে বা দেবতা গ্রহণ করেছে। দেখে আশ্চর্য হই। পরে সহকারি কামাল মিল্লাম দিয়ে এক কোপে পাঠার গলা থেকে মাথা আলাদা করে দেয়। পাঠা কোথাও পালিয়ে যায় নি। একবারও ডাক দেয় নি। নীরব রয়েছে। আমার আবার অন্যরকম মনে হলো, আসনের চারিদিকে সাত বার ঘোরার পর হয়ত পাঠার মাথা ঘুরে গেছে, তাই না-পালিয়ে আসনের সামনে গলা বাড়িয়ে দাঁড়িয়ে থেকেছে। সহকারি কামাল মিল্লাম বা অস্ত্র নিয়ে কাছে গেলেও আর পালায় নি। জোরে জোরে নিঃশ্বাস ফেলে অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে, হত্যা করার সুযোগ করে দেয়। আবার এরকম নাও হতে পারে বিশ্বাসের ব্যাপার-স্যাপার। 

রাতে খাবারের সময় কামাল বা পুজারি আমার কাছে এসে বসে। ছোট মোরগ মেরে আমার জন্যে আলাদা রান্না করা হয়েছে। এমনকি সাংসারেক পরিবারে রান্না করে নি, খ্রিস্টান পরিবারে রান্না করে নিয়ে এনেছে। আমি কামালকে বললাম, তোমাদের শুকরের মাংশ পাঠার মাংশ কোথায় আমাকে দাওনি কেন? কামাল উত্তর দেয়, তুমি খ্রিস্টান পুরোহিত মানুষ আমাদের পুজোর মাংশ খাবে কেন? কোন খ্রিস্টান লোক পুজোর জিনিস মুখে দেয় না, ঘৃণা করে, এমনকি হাতে ছুঁয়েও দেখে না। উল্টো আমাকে বলে, তুমি কেমন পুরোহিত পুজোর মাংশ খেতে চাও! আমি কামাল ও উপস্থিত সকল সাংসারেকদের বললাম, আমরা খ্রিস্টানেরা খাবার সামনে রেখে যীশুর কাছে উৎসর্গ করে প্রার্থনা করলেই যত ধরনের অশুচি খাবার থাকুক সব পবিত্র হয়ে যায়, কোন সমস্যা ছাড়াই খেতে পারি। সাংসারেক গারোরা সবাই অবাক হয়ে যায়, আর বলে, আমরা কোনদিন কোন খ্রিস্টান লোকের মুখে এরকম কথা শুনি নি, তারা পুজোর জিনিস খাওয়া তো অনেক দূরের কথা কাছেই আসে না। 

সাংসারেক গারোরা মনে করে, পুজারি কামালও বলে, সামবা সিয়া তৈরি করলেই বা আসন তৈরি করলেই মিৎদে বা দেবতা আসনে উপস্থিত হয় না, বা, বর হয় না। মোরগ শুকর বা পাঠা মেরে রক্ত আসনে ছিটালে গারো ভাষায় আনচি মারাং সাৎদি সামবা সিয়াতে লাগাতে হয়, তবেই মিৎদে বা দেবতা এসে উপস্থিত হয়, আসনে বর দেয়। এই-ই তাদের বিশ্বাস। কিন্তু তাদের পুজোর অবস্থা দেখে, সামবা সিয়া বা আসন তৈরি দেখে, কামালের মন্ত্র শুনে, মিৎদে বা দেবতাদের নাম শুনে, সাংসারেক গারোদের দেবতাদের প্রতি আমার ধারণা সম্পূর্ণ অন্যরকম হয়ে যায়। আগে আমার ধারণা ছিল মিৎদে শয়তান অশরীরি শক্তি। মিৎদে ইচ্ছে করলে যেকোন মানুষকে অসুস্থ করতে পারে। পাগল বানাতে পারে। আবার যখন তখন মেরে ফেলতে পারে। কাছে গিয়ে মিশে দেখে শুনে বুঝলাম, ব্যাপারটি কিছুই নয়। যেমন মিৎদে সালজং, মিৎদে সালগ্রা, মিৎদে মিকব্রাপ বাংলায় সূর্য দেবতা। এ সূর্যকে সাংসারেক গারোরা সামবা সিয়া বা আসন তৈরি করে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেয়। 

পাঠকগণ আপনারাও চিন্তা করে দেখুন, সাংসারেক গারোরা কামাল বা পুজারিরা এখন আর নেই, সব সাংসারেক গারোরা খ্রিস্টান হয়ে গেছে, কিন্তু, তাদের সূর্য দেবতা এখনো শেষ হয়ে যায় নি। সকালে সূর্য ওঠে, সন্ধ্যায় সূর্য ডুবে যায়, এখনো আগের মতোই ঠিকঠাক চলছে। আমার কথা হলো এই সূর্যের মধ্যে কি মিৎদে শয়তান আছে, সূর্য কি শয়তানী  করে? কিছুই বুঝতে পারি না। সূর্য বেশি গরম দিলে তো এমনি মানুষ গরমে অসুস্থ হয়ে যায়, সর্দি জ্বর হয়, যাদের উচ্চ রক্তচাপ আছে তারা হয়ত গরমে হার্ড স্ট্রোক হয়ে মারা যায়। এখন বুঝে দেখুন, সাংসারেক গারোদের মিৎদে শয়তানের শক্তি কত, কিভাবে এই মিৎদে বা দেবতারা শয়তানী করে, মানুষকে অসুস্থ করে মেরে ফেলে, পাগল বানায়। এই মিৎদে শয়তান, এটা আমাদের বানানো গল্প। মানুষের মনে ভয় ভীতি ঢুকিয়ে দেওয়া। গারো সাংসারেক ধর্ম, মিৎদে বা দেবতারা যেন শেষ হয়ে যায় তার ব্যবস্থা করা, কিন্তু এখানে শয়তান বা শয়তানামী নেই।

তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী


Post a Comment

0 Comments