মিৎদে শয়তান- প্রথম পর্ব ‖ তর্পণ ঘাগ্রা ‖ খু•রাং

মিৎদে ও শয়তান, এ দু’টি শব্দের আলাদা আলাদা অর্থ আছে। মিৎদে হলো সাংসারেক গারোদের পালনীয় মাননীয় ধর্মীয় দেবতা, আর শয়তান হলো সম্পূর্ণ আলাদা অন্যরকম শব্দ। খ্রিস্টান হওয়ার পর খ্রিস্টান গারোরা বা পুরোহিতেরা মিৎদে নামের সাথে শয়তান নাম একসাথে যুক্ত করে মিৎদে শয়তান নাম দিয়েছে, যেটা কোনভাবেই কাম্য ছিল না। 

শয়তান শব্দটি একটি ভীতিকর শব্দ। শয়তান নাম শুনলেই মানুষের মনে ভয় জাগে। ধরে নেয়, অশরীরী শক্তি যেকোন সময় মানুষকে ধরবে, পাগল বানিয়ে দেবে, অথবা, মানুষের ঘাড় মটকিয়ে মেরে ফেলবে এরকম আরো অনেক কিছু। মনে হয় খ্রিস্টান গারোরা সাংসারেক গারোদের মিৎদে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়া অনুষ্ঠানে যেন না যায় তাই এই শয়তানের ভয় ঢুকানো এবং সফলতাও পেয়েছে।



এখন গারোরা প্রায় শতভাগ খ্রিস্টান, সাংসারেক গারোরা আর নেই বললেই চলে, মিৎদে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়া আর কোথাও দেখা যায় না, সব শেষ হয়ে গেছে। গারোরা এখন অশিক্ষিত লেখাপড়া না-জানা সাংসারেক গারো নয়, তারা শিক্ষিত খ্রিস্টান গারো হয়ে গেছে, কিন্তু মন থেকে মিৎদে শয়তানের ভয় সবসময় রয়ে গেছে। সেই ছোট সময় অশিক্ষিত বা অল্প শিক্ষিত মা-বাবা দাদা-দাদী আরো পুরোহিতেরা যে মিৎদে শয়তানের বিষ মনে ঢুকিয়ে দিয়েছে তা শিক্ষিত হয়েও আজও মনের ভেতর লালন-পালন করে রেখেছে। কতটুকু সত্য বা মিথ্যা কোনদিন খুঁজে দেখে নি, চিন্তাও করে নি। এত বড় শিক্ষিত হয়েও বলে সাংসারেক গারোদের মিৎদে শয়তানের জিনিস ওটা ধরো না, সেখানে যেও না, নানা রকম কথা। একবার ঠিক মতো মানুষের মনে ঢুকিয়ে দিতে পারলে সে বিষ আর কোনদিন শেষ হয় না, চলে যায় না, বংশ পরম্পরায় বলে যেতে থাকে, সবসময় জীবিত রাখতে চেষ্টা করে। 

সাংসারেক গারোদের ঈশ্বরের নাম তাতারা রাবুগা। এই তাতারা রাবুগাকে তারা মিৎদে বলে না বলে দাকগিবা রুগিবা বাংলায় সৃষ্টিকর্তা। বাগিবা বরমবি, বাংলায় লালন-পালন কর্তা। তাতারা রাবুগার সন্তানদেরকে নাকি মিৎদে বলে। সাংসারেক কামালরা বলে ‘মিৎ’ মানে মিৎথিনাও দংগিবা নকগিবা বাংলায় অদেখা জায়গায় যে ঈশ্বর থাকে, আর ‘দে’ মানে দেপান্থে বাংলায় সন্তান। মিৎদে মানে অদৃষ্টের বা ঈশ্বরের বা তাতারা রাবুগার সন্তান। যেমন মিৎদে সালজং, মিৎদে আসং, মিৎদে সুসুমি, মিৎদে চুড়া বোডি, মিৎদে বালওয়া বালপ্রং, মিৎদে মিকচি এরকম আরো অনেক মিৎদের নাম পাওয়া যায়। মিৎদেকে বাংলা করলে দেবতা বলা যায়, সাংসারেক গারোরা তাতারা রাবুগাকে মিৎদেরাংনি মিৎদে বাংলায় দেবতাদের দেবতা, এই তাতারা রাবুগাই মিৎদে বা তার সন্তানদেরকে জন্ম দিয়েছে বলে। 

মিৎদে মানে দেবতা আগেই বলেছি, এখন মিৎদে সালজং— ‘সাল’ মানে সূর্য, আর ‘জং’ মানে পোকামাকড়। এই দেবতাকে বাংলায় সরাসরি বলা যায় সূর্য দেবতা। রীতিমতো সূর্য কিরণ দিলে সাংসারেক গারোদের মিমা মিসি বা ধান ফসল ভাল হয়, ধান গাছে যখন ফুল হয় তখন ‘জং’ বা পোকামাকড় উড়ে এসে পরাগায়ন করায়। ধানের ফলন ভাল হয়, ফসল বেশি পায়, তাই সাংসারেক গারোরা উপকারের উপকার স্বীকার করে মিৎদে মিমা মিসি সালজং বা সূর্য দেবতার নামে ওয়ানগালা বা নবান্ন অনুষ্ঠান করে। মিৎদে সালজং বা সূর্য দেবতার জন্যে বাঁশ দিয়ে প্রতীক তৈরি করে যেটাকে তারা নাম দিয়েছে ‘সামবা সিয়া’ নিজেরা ফসল খাওয়ার আগে মিৎদে সালজং বা সূর্য দেবতাকে নতুন ধান ফল-ফলান্তি দিয়ে খায়, এটাই সাংসারেক গারোদের ওয়াননা বা ওয়ানগালা অনুষ্ঠান। এভাবে মিৎদে বালওয়া বালপ্রং বাংলায় বাতাস দেবতা, মিৎদে মিকচি বা বৃষ্টি দেবতা, মিৎদে মিকদো অন্ধকার দেবতা নাম দিয়ে বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন রকমের আসন বা সামবা সিয়া তৈরি করে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেয়। মিৎদে সালজংয়ের বা সূর্য দেবতার আরো কয়েকটি নাম আছে যেমন মিৎদে সালগ্রা, গ্রা গ্রা সাল দিংআনা সালগ্রা, প্রচন্ড রৌদ্রের তাপের জন্যে সালগ্রা নাম হয়েছে, মিৎদে মিকব্রাপ সূর্যকে দেখা যায় না চোখে লাগে বা মিকব্রাবা করে তাই মিকব্রাপ নাম। এভাবে একই মিৎদে বা দেবতার নাম বিভিন্ন রকম নাম হয়ে যা।, আবার গারোদের গোত্র ভেদে একই দেবতার বিভিন্ন নামও হয়ে যায়। অনেকে না-জেনে সাংসারেক গারোদের অনেক মিৎদে বা দেবতা আছে বলে।


গারোরা খ্রিস্টান হওয়ার পর শিক্ষিত অশিক্ষিত বা কোন খ্রিস্টান পুরোহিত সাংসারেকদের বাড়িতে যায় নি, একথা সাংসারেকরা বলে। কোন খ্রিস্টান ছেলে মেয়ে বা যুবক-যুবতীকে বেড়াতে পর্যন্ত আসতে দেয় নি। সাংসারেক গারোরা মিৎদে শয়তানকে পালন করে, তাদের বাড়িতে গেলে শয়তান ধরবে, অসুস্থ করাবে, পাগল বানিয়ে শেষে হয়ত মেরে ফেলবে, এরকম ভয় দেখিয়ে যেতে নিষেধ করে। 

আমি ১৯৯৭-৯৮ খ্রিস্টাব্দে অনেক সাংসারেকের বাড়িতে গিয়েছি, কামাল বা পুরোহিতের সাথে আলাপ করেছি, একসাথে খেয়েছি, তাদের বাড়িতে ঘুমিয়েছি, মিৎদে সম্পর্কে জানতে পেয়েছি। ব্রাদার গিয়োমের প্রোগ্রামে আমি গ্রামে-গ্রামে রেরে, আজিয়া, সেরেজিং, গারো নাচ, ধর্মীয় ছোট ছোট গারো গান প্রতিযোগিতা দিয়েছি। সাংসারেকরাও দেখতে এসেছে। এভাবেই তাদের সাথে পরিচয়। 

ব্রাদার গিয়োম খ্রিস্টান পুরোহিত আমাকেও তারা খ্রিস্টান পুরোহিত মনে করেছে। তাদের জন্যে আমি দামা রাং ক্রাম দিয়েছি। পরে আমি তাদের আরো কাছের লোক হয়ে যায়। এভাবে গাজিরভিটা গ্রামের বড় কামাল দরিশ আজিম, ধুমনিকুড়া গ্রামের ভূইঞা কামাল, কাইথাকোনা গ্রামের আদোৎ মানকিন কামাল, ঢাকিয়াপাড়া বা বালওয়া কান্দা গ্রামের রমেশ মানকিন কামাল, মধুপুরের সহিন কামাল আরো অনেক কামালের সাথে পরিচয় হয়। পরে আদং গোত্রের কামাল, নলচাপড়া গ্রাম আরো ভরতপুর গ্রামের কামালের সাথে দেখা হয়, কথা হয়। আমি বারবার তাদের বাড়িতে গিয়েছি। মাঝে মাঝে রাতে থেকেছি।

তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।


Post a Comment

0 Comments