ঘাগ্রা মাচং চাৎচি বা উপাধি ‖ তর্পণ ঘাগ্রা ‖ দ্বিতীয় পর্ব ‖ খু•রাং


কিন্তু ভারতের মেঘালয় রাজ্যের গারো হিলসে ঘাগ্রা মাচং চাৎচি বা উপাধির সাথে যুক্ত নামের গুরুত্ব অনেক। যে ঘাগ্রার বাড়িতেই যাও ঘাগ্রা উপাধি বলার সাথে সাথে কি ঘাগ্রা জিজ্ঞেস করবে। ঘাগ্রা মাৎচি, ঘাগ্রা কলাবাড়ি, ঘাগ্রা আব্রং নাকি অন্য ঘাগ্রা! যদি না মিলে, একই মাচং চাৎচি বা উপাধি ঘাগ্রা হলেও বেশি মূল্য দেবে না। আদর যত্ন করবে না। হয়ত রাতে থাকতেও দেবে না। চলে আসতে হবে। আর যদি মিলে যায় তাহলে তো কথা নেই, ভাল মনে থাকতে দেবে, আদর যত করবে, পরিবারের লোকেরা ব্যস্ত হয়ে যাবে, আলাপ-আলোচনা হবে। হয়ত এক বেলা মাংস দিয়ে ভাতও খাওয়াবে। সামর্থ থাকলে কাপড় চোপড়ও কিনে দেবে। আসার সময়ও খালি হাতে ছাড়বে না, সব ঘাগ্রা মাহারির বা উপাধির কাছ থেকে পঞ্চাশ টাকা একশত টাকা করে তুলে হাজার দুই হাজার ব্যবস্থা করে হাতে ধরিয়ে দেবে। নিতে না চাইলেও জোর করে দেবে। বলবে, কিছুই নেই, কিছুই দিতে পারলাম না। এ কয়েকটি টাকা যাতায়াত খরচ করতে দিয়ে দিলাম। শুধু টাকা পয়সা নয়, পাকা ফল-ফলান্তি থাকলে ব্যাগ ভরে দিয়ে দেবে এটাই গারোদের নিয়ম।

আমি মেঘালয় রাজ্যের গারো হিলসে যখন গিয়েছি তখন ঘাগ্রা মাচং চাৎচি বা উপাধির বাড়িতে যেতাম, তারা প্রথমেই জিজ্ঞেস করতো আমি কোন ঘাগ্রা? চালাকি করে আমি উল্টো তাদেরকে জিজ্ঞেস করতাম, আপনারা কোন ঘাগ্রা? তারা যদি বলে আমরা ঘাগ্রা মাৎচি, আমিও বলি, হ্যাঁ, আমিও ঘাগ্রা মাৎচি মাচং মাহারি বা উপাধি। এভাবে কত ঘাগ্রার বাড়িতে গিয়ে আদর যত্ন পেয়েছি তার শেষ নেই। আসল কথা হলো, আমি নিজেও জানি না, আমি কোন ধরনের ঘাগ্রা। বাংলাদেশে এ ধরনের কোন চর্চা নেই।

নিজেদের সম্পর্কে জানার কত বাকি রয়ে যায়, গারো গ্রাম না ঘুরলে এসবের ধারে-কাছেও যেতে পারতাম না। হয়ত আরো অনেক বাকি রয়ে গেছে, আমি যা লিখলাম তা শেষ নয়। আরো ভিন্ন জায়গায় ভিন্নরকম থাকতে পারে। যখন ঘাগ্রা মাচং চাৎচি মাহারি বা উপাধির বছরে একবার শীতকালে মিটিং মেলা হয় তখন যে ঘাগ্রার ইতিহাস জানে সে সবার সামনে একটি একটি করে সব জানা-অজানা খবর বলে দেয়। কোন কোন উপাধি ঘাগ্রা উপাধি থেকে বের হয়েছে, এখন আর ঘাগ্রা লেখে না, অন্য উপাধি নেয়, লেখে, তারা কোন উপাধির লোক। নিয়ম-কানুনও বলে দেয়, যেমন সিমসাংয়ের সাথে ঘাগ্রার বিয়ে হবে না, তারা আলাদা উপাধি নিয়েছে বলে আলাদা নয়, ফেলে দেওয়া যায় না। এরকম অনেক অজানা কাহিনী জানা যায়। এ মাহারি বা উপাধির মিটিং মেলা হয় গারো হিলসে। বাংলাদেশের ঘাগ্রাদের মাহারি মিটিং মেলা আর হয় না, জানারও কোন উপায় নেই, কেউ লিখে দলিল আকারেও রাখে নি, প্রয়োজন মনে করে নি। এ দেশের গারোরা গারোদের সংস্কৃতি ইতিহাস কোন কিছুই ধরে রাখে নি। ভাল সংস্কৃতি খারাপ সংস্কৃতি সবকিছুই একই ঝুড়িতে ফেলে দিয়েছে। এখন ভাল জিনিসও খারাপের সাথে পচে গেছে। নিজের সংস্কৃতি ইতিহাস বেতালা হয়ে গেলে জাতির সব কিছুই তাল-মাতাল হয়ে যায়, কোন কিছুকেই ঠিক রাখা যায় না, সংস্কৃতির নিয়মে বেঁধে রাখলে তবে সব ঠিক থাকে।

ঘাগ্রা, গারা, গারে, গারাই, কাকড়া নেওয়ার কারণ বা ইতিহাস পুরোপুরি ভাল না জানা গেলেও গাবিল মাচং চাৎচি বা উপাধির লম্বা ইতিহাস কাহিনী পাওয়া যায়। যারা গাবিল মাচং চাৎচি বা উপাধি নিয়েছে, তাদের কাছ থেকেই পাওয়া। আফগানিস্তানের রাজধানীর নাম কাবুল, এ কাবুলের বীর মুসলিম রাজার সৈন্যরা যুদ্ধ করতে করতে, দেশ জয় করতে করতে, গারোদের এলাকায় ঢুকে পড়ে। গারো যোদ্ধারা মিল্লাম বা তলোয়ার নিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলে। গারো যোদ্ধাদের সাথে আফগান সৈন্যদের তুমুল যুদ্ধ বাঁধে। গারো যোদ্ধারা আফগান সৈন্যদের হত্যা করে, পরাজিত করে। কিছু সৈন্য পালিয়ে রাজধানী কাবুলে যায়।

আফগান বীর রাজা শুনে গারোদের ওপর ক্ষিপ্ত হয়ে যায়। তার সৈন্য হত্যার প্রতিশোধ নিতে হাজার হাজার প্রশিক্ষিত সৈন্য নিয়ে নিজে গারোদেরকে আক্রমণ করে। প্রশিক্ষিত আফগান রাজার সৈন্যদের সাথে গারো মাৎগ্রিক বা বীরদের তুমুল যুদ্ধ হয়। অনেক বীর গারো যোদ্ধা মারা পড়ে। প্রশিক্ষিত রাজার সৈন্যদের সাথে পেরে উঠে নি। গারোরা সম্পূর্ণ পরাজিত হয়। বড় বড় গারো নকমারা আত্মসমর্পণ করে। আফগান রাজাকে গারো এলাকায় ঢুকতে দেয়। এছাড়া বেঁচে থাকার কোন উপায় খুঁজে পায় নি। রাজা গারো গ্রাম এলাকা ঘুরতে ঘুরতে, দেখতে দেখতে, এক অপরূপা সুন্দরী গারো যুবতীকে দেখে মুগ্ধ হয়ে যায়। এমন হলুদ বর্ণের সুন্দরী যুবতীকে সে কোনদিন দেখে নি। রাজা সৈন্যদের আদেশ দেয়, এ সুন্দরী যুবতীকে যেন স্ব-সম্মানে রাজধানী কাবুলে নিয়ে যায়। সৈন্যরা গারো যুবতীকে তুলে নেওয়ার সময় যুবতী অনেক জোরাজুরি করে, কান্নাকাটি করে, সাহায্য চায়। কিন্তু গারো নকমাদের মাৎগ্রিক বা বীরদের কোনকিছু করার উপায় ছিল না, তারা শুধু চেয়ে চেয়ে দেখেছে, আর চোখের পানি ফেলেছে। যুবতীর মা ভাই বোনেরা বুক ভেঙে চিৎকার করে কেঁদেছিল। কাবুলের রাজা সৈন্যরা চলে যাওয়ার পড়েও ঘাগ্রা যুবতীর মায়ের কান্না থামে নি। এলাকার কোন গারো মহিলা আত্মীয়-স্বজন তার কান্না থামাতে পারে নি। পরে মা মেয়ের জন্যে চিন্তা করতে করতে কাঁদতে কাঁদতে মারা যায়।

সুন্দরী ঘাগ্রা যুবতীকে স্ব-সম্মানে কাবুলে নিয়ে গিয়ে রাজা আনুষ্ঠানিকভাবে বিয়ে করে। মুসলিম রীতিনীতি অনুসারে সব ব্যবস্থা করে, এটাই তখনকার নিয়ম। বলা হয়, ঘাগ্রা মহিলা রাজধানী কাবুলে দীর্ঘদিন রাজার তৃতীয়া স্ত্রী হিসেবে থাকে, সেখানে ঘাগ্রা মহিলার গর্ভে ছয়টি মেয়ে চারটি ছেলে সন্তান হয়। তারা মুসলিম রীতিনীতি অনুযায়ী বড় হতে থাকে। ছেলে মেয়েরা যখন মোটামুটি বড় হয় তখন আফগানিস্তানের রাজা মারা যায়। নিয়ম অনুযায়ী রাজার প্রথম স্ত্রীর সবচেয়ে বড় ছেলে বাবার উত্তরাধিকার হিসেবে সিংহাসনে বসে রাজা হয়। রাজা মারা যাবার পর ঘাগ্রা মহিলা ও তার ছেলেমেয়েকে বর্তমান রাজা ভাল চোখে দেখে নি, তাদেরকে হেনস্থা করে অতিস্থ করে তুলে। রাজধানী কাবুলে থাকার আর পরিবেশ হয় নি। ঘাগ্রা মহিলা বর্তমান রাজার কাছে আবার গারো আত্মীয়-স্বজনদের কাছে যেতে প্রস্তাব দেয়, রাজা তৃতীয় মায়ের ইচ্ছাকে অমর্যাদা করে নি, ঘাগ্রা মহিলার প্রস্তাব গ্রহণ করে। তার পাওনা সবকিছু মিটিয়ে দিয়ে ছেলেমেয়ে সহ স্ব-সম্মানে রাজকীয় মর্যাদায় গারো এলাকায় ফিরিয়ে নিয়ে দিয়ে আসে।

দীর্ঘদিন পর ঘাগ্রা মহিলা ছেলে মেয়ে আবার নিজের আত্মীয়-স্বজনদের সাথে মিলিত হয়। কয়েক বছর পর স্বজাতি গারো যুবক-যুবতীদের কাছে ছেলেমেয়েদের বিয়ে দিয়ে দেয়। বউ জামাই পায়। নাতি নাতনি হয়। আর কোনদিন স্ব-জাতিকে ছেড়ে রাজধানী কাবুলে ফিরে যায় নি। রাজধানী কাবুল থেকে ছেলেমেয়েদের নিয়ে ফিরে আসার কারণে তাদেরকে অন্য ঘাগ্রারা নামের সাথে কাবুল ডাকতে চায় কিন্তু তারা কাবুলের নাম ঠিকমতো উচ্চারণ করতে পারে নি। তারা সবাই বিকৃতভাবে নামটি গাবুল বলে, এ গাবুল থেকে আস্তে আস্তে শেষে গাবিল হয়ে যায় বলে। এভাবে পরবর্তীতে রাজধানী কাবুল থেকে আসা ঘাগ্রা মহিলার বংশধরেরা গাবিল মাচং চাৎচি বা উপাধি নেয় বলে।

লেখাটি শেয়ার করুন...

Post a Comment

0 Comments