গ্রামটির নাম ভূঁইয়াপাড়া। গ্রামটি নেত্রকোনা জেলার অধীনস্থ ধোবাউড়া উপজেলার প্রায় পাঁচ মাইল উত্তরে নিতাই নদের ধারে সুন্দর মনোরম পরিবেশে অবস্থিত। যদিও নদটি খরস্রোতা তবু জোয়ারের পর উপহার স্বরূপ দিয়ে যায় উর্ব্বরা পলি। আর এ পলি মাটিতে বছরের পর বছর এলাকার গারো, হাজং, বাঙালি জনগণ সোনালী ফসল ফলিয়ে নির্বিঘ্নে দিনাতিপাত করছে।
প্রায় একশত বছর আগের কথা। এ গ্রামে চন্দ্র ভূঁইয়া নামে এক লোক বাস করত। তিনি জাতিতে গারো ছিলেন। তিনি ছিলেন ধনী ও খুবই শক্তিশালী। এক কথায় তিনি রাজার হালে দিনাতিপাত করতেন। আর অত্র এলাকার গারোরা তাকে রাজা বলে শ্রদ্ধা ও সম্মান প্রদর্শন করত। কিন্তু তিনি আজ আর নেই, একশত বছর আগে কালের স্রোতে হারিয়ে গেছেন। আর সেই অশিক্ষিত গারো সমাজ যুগের পরিবর্তনের সাথে-সাথে শিক্ষার আলো পেয়ে গড়ে উঠেছে, সভ্যতার আলোয় আলোকিত হয়েছে, নতুন জগতের সাথে তাল মিলিয়ে এগিয়ে চলেছে আলোর পথে।
চন্দ্র গারো ভূঁইয়া উপাধি পেয়েছিলেন।
![]() |
| ভূঁইয়াপাড়া গ্রাম ঘেঁষে বয়ে যাওয়া পাহাড়ি নিতাই নদ। |
তাঁর আমলে এ গ্রামে একটি ঘটনা ঘটেছিল। বালিগাঁও নামক পাশের গ্রামে পাইনার সরকার নামে এক লোক বাস করতেন। তিনি জাতিতে হাজং ছিলেন। তিনি যেমনি চতুর ছিলেন, তেমনি ছিলেন তন্ত্রে-মন্ত্রে পারদর্শী। দেব-দেবীর সাধনার বলে বহু জ্ঞান ও গুণ লাভ করেছিলেন। আর সেই দেব-দেবীর সাধনার বলে যেকোন কাজ অনায়াসে সাধন করতে পারতেন। আর এ সমস্ত জ্ঞান দেখে লোকে সর্বদা তাকে গুরু বলে সম্মান প্রদর্শন করে চলত। তিনি মাঝে-মাঝে এমন অসাধ্য কাজ করতেন তা দেখে লোকজন আরো আশ্চর্য হয়ে যেত। তা ছাড়া তান্ত্রিকতার বলে তিনি এলাকাতে প্রভাবশালী হয়ে উঠেছিলেন। আর এ তান্ত্রিক ক্ষমতা পাইনার সরকারকে জমিদার হওয়ার লালসায় জাগিয়ে তোলে। আর এ লালসার বশবর্তী হয়ে তিনি চন্দ্র ভূঁইয়ার সম্পত্তির ওপর বাসনাকে প্রসারিত করেন। অনায়াসেই তিনি তাঁর বাসনাকে বাস্তবে রূপায়ন করতে পেরেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তিনি উল্লেখযোগ্য ভূ-সম্পত্তির অধিকারী হয়ে তালুকদার উপাধি লাভ করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
কিভাবে তিনি উদ্দেশ্য সিদ্ধ করেছিলেন সে কথায় আসা যাক।
একদিন পাইনার সরকার লোক মারফত একটি আমন্ত্রণ পত্র ভূঁইয়ার কাছে পাঠালেন। লোকটি পত্রখানা নিয়ে গন্তব্য পথে চলে গেলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই পত্রবাহক ভূঁইয়ার প্রাসাদে পৌঁছলেন এবং পত্র ভূঁইয়ার হাতে দিলেন। ভূঁইয়া পত্র বাহককে বিশ্রামের নির্দেশ দিয়ে পত্র পাঠে মনোযোগ দিলেন, পত্র পাঠের শেষে কিছুক্ষণ চিন্তা করলেন এবং আমন্ত্রণ রক্ষার সম্মতি প্রকাশ করে লোকটিকে বিদায় দিলেন। কিন্তু এভাবে হঠাৎ আমন্ত্রণের কথা চিন্তা করে কোন সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারলেন না। এদিকে পত্র বাহকের কাছে শুভ সংবাদ জেনে সরকার মনে-মনে খুবই আনন্দ প্রকাশ করলেন আর ক্ষণিকের মধ্যে বেশ কিছু আয়োজন করার জন্য লোকটিকে আদেশ দিলেন। আর ভূঁইয়ার প্রিয় জিনিস মদও আয়োজন করতে ভুল করলেন না। দিন যায় এমনিভাবে তালুকদারের আমন্ত্রণের দিন ঘনিয়ে এল; এদিকে ভূঁইয়া কয়েকজন সহচর নিয়ে সরকারের বাটির উদ্দেশ্যে রওয়ানা হলেন। কিছুক্ষণের মধ্যেই তারা সরকারের প্রাসাদে পৌঁছে গেলেন। আর সরকার তা দেখে সসম্মানে অতিথিবৃন্দকে অভ্যর্থনা জানালেন। কিছুক্ষণ পরই আরম্ভ হলো আলোচনা সভা এবং পর-পরই শুরু হলো মূল বিষয় নিয়ে আলোচনা। আর তার সাথে চললো মদ পান। এ সমস্ত আয়োজন করার জন্য ভূঁইয়া পাইনার সরকারকে ধন্যবাদ জ্ঞাপন করতে ভুল করলেন না।
সরকার এক সময় ভূঁইয়াকে বললেন, আপনার যে সম্পত্তি তা আমার অর্ধেক প্রাপ্য। বহুদিন যাবৎ আপনার সাথে এ ব্যাপার নিয়ে আলোচনায় বসবো বলে চিন্তা করছিলাম কিন্তু সময় ও সুযোগ হয়ে ওঠে নি। বিশ্বাস না হয় এ দেখুন আমার ‘কাগজ পত্র’। এ কথা বলে স্বর্ণাক্ষরে লেখা সনদপত্র ভূঁইয়ার সামনে তুলে ধরলেন। আর তা দেখে ভূঁইয়ার মাথা ঘুরপাক খেল। এভাবে রাত কেটে গেল এবং ভোরে ভূঁইয়া নিজ গৃহে চলে এলেন। এরপর তাদের দু’জনের মধ্যে বিরাট কলহ। কয়েকদিন পর ভূঁইয়া বৃটিশ সরকারের কাছে এক মামলা দায়ের করলেন।
একদিন কাগজপত্র নিয়ে সরকারকে কোর্টে হাজির হওয়ার নির্দেশ এল। তারিখ মোতাবেক সরকার কাগজপত্রসহ কোর্টে হাজির হলেন এবং কিছুক্ষণ পর ভূঁইয়াও তার কাগজপত্রসহ হাজির হলেন! এক-এক করে দু’জনের কাগজপত্র হাকিম দেখে নিলেন এবং আশ্চর্য হয়ে গেলেন, কারণ, কারো কাগজপত্র মিথ্যা বলে প্রমাণিত করা সম্ভব নয়।
![]() |
| নিতাই নদ : শুকনো মৌসুমে বাঁশের সাকো দিয়ে মানুষের পারাপার |
পরে হাকিম ভূঁইয়া ও সরকারকে বললেন, ‘আপনাদের দু’জনের কাগজই ভুল বলে প্রমাণিত করতে পারছি না। তবে একটি উপায়ে আপনাদের মীমাংসা করে দিতে পারি। যেহেতু দু’জনার কাগজপত্র সত্য বলে প্রমাণ করছে তবে আপনারা ঝগড়া-বিবাদ না করে এ সম্পত্তি সমান ভাগে ভাগ করে নিতে পারেন।’ ভূঁইয়া জবাবে বললেন, ‘এ হতে পারে না, আর এ মীমাংসা আমি গ্রহণ করতে পারলাম না।’ হাকিম অনেক বুঝানোর পরও শেষ সিদ্ধান্তে পৌঁছতে পারলেন না এবং শেষ কথা বলে দিলেন, ‘আমার কাছে এরপর আর সুবিচার আপনারা পেতে পারেন না।’ আপনারা যেভাবে পারেন সেভাবেই মীমাংসায় উপনীত হতে পারেন। দু’জনই বিদায় নেওয়ার পর তাঁরা যার-যার বাটিতে পৌঁছলেন। দিন যায় সরকার তার আশা উদ্দীপনাকে দমিয়ে রাখতে না পেরে একদিন কিছু সংখ্যক লোক লস্কর নিয়ে ভূঁইয়ার প্রাসাদ আক্রমণ করলেন। বুদ্ধিমান তালুকদারের এ অতর্কিত আক্রমণ রোধ করতে না পেরে ভূঁইয়া আত্মসমর্পণ করলেন। তবে তালুকদার বন্দীকে কোন অত্যাচার না করে তার বশ্যতা স্বিকার করার জন্য বললেন। ভূঁইয়া কোন উপায়ান্তর না দেখে তাই করলেন এবং কয়েকটি শর্তে বন্দীকে মুক্তি দিলেন। পাইনার সরকার এখন তালুকদার। এমনিভাবে দিন যায় ভূঁইয়ার মনে শান্তি নাই। শেষে চিন্তা করলেন, আর নয়, এ দাসত্ব জীবন থেকে মুক্তি নিতে হবে।
একদিন সন্ধ্যায় তালুকদার সরকার তার আরাধনা দেবীর পূজোয় আসন গ্রহণ করলেন। সে সময় দেবীর মন্দিরে হঠাৎ চার-পাঁচজন লোক এসে মন্দির থেকে তালুকদারকে দৈত্যের মতো থাবা মেরে নিয়ে চলে গেলেন। তালুকদার মুখ দিয়ে কোন কথাই বলতে পারলেন না। উপরন্তু বাটির লোকজনও টের পেল না। কারণ পূজোর সময় কেউই তার মন্দিরের কাছে যেত না। রাত প্রায় এক প্রহর হয়ে গেল তালুকদার বাটিতে এখনও ফিরছে না ভেবে তালুকদারের মা মন্দিরের কাছে এসে ডাক দিলেন কিন্তু কোন সাড়া নেই—পর-পর কয়েকবার ডাক দিলেন কিন্তু চারিদিক থেকে উত্তর এল নাই, নাই! আবারো মা প্রাণ-ফাটা চিৎকার করে ডাক দিলেন। আকাশ-বাতাস সবাই ইশারায় মাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে নাই! নাই! কিছুক্ষণের মধ্যেই শুরু হলো বাটিতে কান্নার রোল। কিন্তু, হায়! তখন এ কান্না আর কে শুনে!
এদিকে ভূঁইয়া তালুকদারকে এনে তালুকদারের দেহ খণ্ডিত করলেন। প্রতিশোধের নেশায় তালুকদারের দেহকে কয়েক খণ্ডে বিভক্ত করলেন। কিন্তু আশ্চর্য! তবুও খণ্ডিত দেহ কথা বলছে। তালুকদারের দেহ বলছে, ‘ভূঁইয়া তুমি যতই চেষ্টা করো আমার প্রাণ বায়ু রোধ করতে পারবে না।’ ভূঁইয়া বললেন, ‘তালুকদার! সত্যি তোমাকে হত্যা করতে গিয়ে আমি দুঃখিত, কেননা তুমি যে জ্ঞানের অধিকারী ছিলে তা আমি জানতাম না। আগে যদি জানতাম, হয়তো এ ঘটনা ঘটতো না। তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও ভাই, আমি ভুল করেছি।’ তালুকদার বললেন, ‘ঠিক আছে, আমি তোমাকে ক্ষমা করে দিলাম, তবে মাকে একবার সংবাদ দাও।’ ভূঁইয়া তাই করলেন। মা তালুকদারের এ অবস্থা দেখে সহ্য করতে পারলেন না, চিৎকার করে প্রাণ-ফাটা কান্নায় ভেঙে পড়লেন এবং প্রতিশোধ নিতে বললেন। কিন্তু সাথে-সাথে মায়ের কথায় বাধা দিয়ে সান্ত্বনার স্বরে বললেন, ‘মা! আমার এ মৃত্যুতে কারো দোষ নেই আর কাউকে প্রতিশোধ নিও না। কারণ এ মৃত্যুর জন্য দায়ী আমি নিজেই। আর যদি কারো প্রতি এর প্রতিশোধ নাও তবে আমার আত্মা শান্তি পাবে না। তুমি ভূঁইয়াকে গ্রহণ করো ও আমার আরাধনা দেবীর পূজোর ভার আমার ছেলের কাছে অর্পণ করো।’ তালুকদার যন্ত্রণায় ছটফট করতে লাগলো, কেননা যে ক্ষত তার দেহে সাধারণ মানুষের পক্ষে তা সহ্য করার মতো নয়। তালুকদার মা’কে বললেন, ‘মা, আমার দক্ষিণ বাহুতে একটি ‘তাবিজ’ আছে তা খুলে ফেল।’ মা আর বিলম্ব না করে অস্ত্রের সাহায্যে তাবিজ খুলে ফেললেন। মুহূর্তের মধ্যে তালুকদারের খণ্ডিত দেহ নীরব হয়ে গেল। আর সেদিন থেকে এ গ্রামের নাম ভূঁইয়াপাড়া নামে আখ্যায়িত হলো। আর পাইনার তালুকদার! আজও পাইনারের তান্ত্রিক ক্ষমতার কথা সে অঞ্চলে কিংবদন্তি হয়ে বিরাজ করছে।
লেখাটি শেয়ার করুন...



0 Comments