ওয়াননা ওয়ানগালা- পঞ্চম পর্ব ‖ তর্পণ ঘাগ্রা ‖ খু•রাং



তৃতীয় দিন : ক্রাম গগাদা বা জল ওয়াৎদানি সাল

ক্রাম গারো ভাষার শব্দ, বাংলায় এক ধরনের কুল, ঢোলের মতো কাঠ দিয়ে তৈরি। এটা কুল বাদ্যের মতোই একপাশে ডানে বড় থাকে আর বাম পাশে সরু ও ছোট থাকে। ক্রাম ঢোলের সাথে সবসময় ছোট ঢোল থাকে, এটাকে গারোরা নাটিক বলে। ক্রাম ঢোল বানানোর সময় বড় গাছ খুড়ার সময় ঠিক মাঝখান থেকে বা পেট থেকে নাটিক বা ছোট দামা তৈরি করতে হয়। ক্রাম দামার পেট থেকে বের করতে হয় বলে সাংসারেক গারোরা ছোট দামাকে ক্রাম দামার সন্তান বলে। ক্রাম ও নাটিক মা ও সন্তান সাংসারেকদের কাছে অন্যরকম গুরুত্ব পায়। সব গাছ থেকে ক্রাম ও নাটিক তৈরি করা যায় না, ক্রাম নাটিক গামারী গাছ থেকে তৈরি করতে হয়। গামারী গাছ দুই প্রকার, একটির পাতা বড়, অন্যটির পাতা ছোট। ছোট পাতা গামারী থেকে ক্রাম নাটিক তৈরি করতে হয়। ছোট পাতার গামারী গাছকে গারোরা গামারী স্কাল বলে। ‘স্কাল’ গারো ভাষার শব্দ, স্কালের বাংলা শব্দ রাক্ষস বা ডাইনী। এই গামারী গাছের গন্ধ কোন কোন মানুষকে অসুস্থ করে দেয়, এটাকে গারোরা ক্রাম চিকগা বলে। 

এতক্ষণ ক্রামের কথা বলেছি, এখন ‘গগাদা’র কথায় আসি। ‘গগাদা’র বাংলা অর্থ তুলে রাখা, তার মানে শেষ বাজনা বাজিয়ে আর বাজাবে না, তুলে রাখবে, এটাই ওয়ানগালার শেষ দিন বা তৃতীয় দিন, এরপরে আর ওয়াননা চাআ করতে যাবে না। এই ‘ক্রাম গগাদা’ বা ‘জল ওয়াৎদা’ এটাই ওয়ানগালার শেষ পর্ব। এই দিন সবাই ওয়াননা চাআর বাড়ি থেকে বা নিজের বাড়ি থেকেও সবাই ঢোল বাজিয়ে বাঁশি বাজিয়ে নকমার বাড়িতে উপস্থিত হবে। এই দিনে নকমা নিজেই চাচাৎ সওয়া বা সুগন্ধি ধোপ পুড়বে, কিছু মদ আসনের সামনে বা ‘সামবা সিয়া’র সামনে আনুষ্ঠানিকভাবে ঢালবে মিমা মিসিনি মাগিবা রংকিমেমাকে বিদায় দেবে। রংকিমের আসল নাম ‘মেয়ানমা রংকিমেমা’। এই রংকিমেমা ধানের মাতা, সে থাকে মহা সমুদ্রে। রংকিমেমা যদি ঠিক সময়ে সমুদ্রের পানিকে বৃষ্টি রূপে না পাঠায় তাহলে সাংসারেক গারোদের ‘মিমা মিসি’ বা ধান ফলন হবে না। মেয়ানমা রংকিমেমার কাজ থেকেই নাকি মিসি সালজং দেবতা ধানের বীজ এনে সাংসারেক গারোদের জন্যে দিয়েছে, সর্বপ্রথমে বিধবা আয়সে মহিলা ও তার ছেলে পিতৃহীন দৎদিকে দিয়েছিল। নকমা সুগন্ধি ধোপ জ্বালিয়ে মদ ঢেলে বা রোগালা করে সবার সামনে সুর তাল ছন্দ মিলিয়ে এভাবে মিংয়ে চংয়ে বা মন্ত্র পাঠ করে। 



গারো ভাষায়—
ওয়ে আমা মেয়ানমা রংকিমেমা
নাআন পাৎথিগিপা নাআন অনগিপা।
নাআন সাগালনি চিকো আগানে
গাদিলাকো ওয়াৎদা মিককাকো ওয়াৎদা।
নাংনা চাচাৎ সওজক রোগালজক
উকো চায়ে রিংয়ে রেপিলবো
সাল সময় সকজকনো চিংনা
গাদিলা মিককাকো ওয়াৎদেৎবো
পয়শ্রী পয়শ্রা

বাংলায়—
ওয়ে মা মেয়ানমা রংকিমেমা
তুমি যোগাও তুমি খাওয়াও।
তুমি সমুদ্রের পানিকে বলে
মেঘ পাঠাও বৃষ্টি ঘটাও।
তোমাকে ধোপ দিয়েছি মদ দিয়েছি
ওটা খেয়ে পান করে যাও।
নির্দিষ্ট সময়ে আমাদেরকে
মেঘ বৃষ্টি পাঠাও।
পয়শ্রী পয়শ্রা।

নকমার এই ‘মিংআ চংআ’ বা মন্ত্র অনেক লম্বা শুধু জানার জন্যে কিছু লিখলাম মাতা মেয়ানমা রংকিমেমাকে বিদায় জানানোর সাথে সাথে নকমা মিৎদে বা দেবতা মিসি সালজংকেও বিদায় দেয়। সাংসারেক গারোদের বিশ্বাস হাড় ভাঙা পরিশ্রম করে জুম চাষ বা ফসল লাগালেও দেওয়ার মালিক যদি না দেয়, তাহলে তারা কিছুই পাবে না, তাই এত অনুরোধ এত অনুষ্ঠান। মাতা রংকিমেমা মিৎদে বা দেবতা মিসি সালজংকে খুশি করতে না পারলে বৃথা শ্রম, বৃথা চাওয়া। কোন বছর ফসল খারাপ হলে, মনে করে কেউ তাদেরকে অপমান করেছে সম্মান দেখায় নি। তাই তারা ওয়ানগালার সময় মা মেয়ানমা রংকিমেমা আর মিৎদে মিসি সালজংয়ের কাছে মনে প্রাণে কেঁদে কেঁদে ক্ষমা চায়, মাপ করে দিতে বলে আর এরকম হবে না বলে প্রতিশ্রুতি দেয়। এমনিভাবে ওয়ানগালার শেষ পর্ব ‘ক্রাম গগাদা’ বা ‘জল ওয়াৎদা’ শেষ হয়, দামা দাদি রাং ক্রাম আদুরো বাংশি সব বাদ্য যন্ত্র আনষ্ঠানিকভাবে নকমার বাড়িতে নির্দিষ্ট জায়গায় রাখে।

তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।

লেখাটি শেয়ার করুন...

Post a Comment

0 Comments