ওয়াননা ওয়ানগালা- শেষ পর্ব ‖ তর্পণ ঘাগ্রা ‖ খু•রাং

ওয়ানগালার নিয়ম না মানলে কি হয়

আসি মালজা স্বামী-স্ত্রী। আসি স্বামী, আর মালজা স্ত্রী। ছেলে মেয়ে নেই, দু’জনে আলাদা সংসার করে। স্বামী-স্ত্রীর অনেক মিল। সুখের সংসার। স্বামী-স্ত্রী দু’জনি সমাজের নিয়ম-কানুন ওয়ানগালার নিয়ম, মিৎদে সালজং, ধান বীজের মা মেয়ানমা রংকিমেমাকে মানতে চায় না। তারা বলে সেই আগের দিন শেষ এখন নিয়ম মানার কোন দরকার নেই। আসি মালজা স্বামী-স্ত্রী ওয়ানগালার আগেই নতুন পাকা ধান কেটে চাউল বানিয়ে রান্না করে খায়, আককারো কবক বা কুমড়া সবজি মিৎদে সালজংকে না দিয়ে পেড়ে তরকারি রেঁধে খায়। ওয়ানগালার আগে জল ওয়াৎদা পর্বকে সাংসারেক গারোরা আলাদাভাবে মানে, ওই দিন নকমা নিজে পাহাড়ী ঝরনায় খুব সকালে যায় দু’টি কাঁকড়া ধরে। ওয়ানগালার প্রস্তুতি শুরু করে। এলাকার লোক সবাই ওইদিন কোন কাজ কর্ম করবে না। এমনকি নিজেদের আত্মীয়-স্বজনের বাড়িতেও বেড়াতে যাবে না। বাড়িতেই খেয়ে ঘুমিয়ে বিশ্রাম করে দিন শেষ করে দেবে, এটাই সাংসারেক গারোদের নিয়ম যাকে তারা ‘সাল নিমমা’ বলে। ‘সাল’ মানে সূর্য, ‘নিমমা’ মানে কাজ থেকে বিরত থাকা। আবার অনেকে বলে নিমমা মানে পাপ অর্থাৎ পাপ কাজ থেকে বিরত থাকা। পাপ বাংলা শব্দের গারো ভাষায় ব্যবহার দেখি না, বাংলা শব্দ পাপকেই ব্যবহার করে। 


সাল নিমমার দিন আসি জঙ্গল থেকে জ্বালানী কাঠ সংগ্রহ করতে যায়, হঠাৎ বনের বাঘ আসির ওপর ঝাপিয়ে পড়ে কামর দিয়ে মেরে ফেলে। আসি বাঘের খাবার হয়ে যায়। আর তার স্ত্রী মালজা হাড়ি পাতিল পরিষ্কার করতে ‘চিরিং ওয়ারি’ বাংলায় গভীর ঝরনার পানিতে যায়, হঠাৎ জলের কুমির এসে মালজাকে কামর দিয়ে নিয়ে যায় খাওয়ার জন্যে। এভাবে সূর্য ডোবার আগেই আসিকে বাঘে মারে আর স্ত্রী মালজাকে কুমির মেরে ফেলে। পরের দিন গ্রামের লোকেরা তাদেরকে ঘরে দেখতে না পেয়ে জঙ্গলে ঝরনার পানিতে খুঁজে। গ্রামের লোকেরা জঙ্গলে আসির রক্ত মাখা জামা কাপড় খুঁজে পায়, আর মালজার দেহের কিছু অংশ গভীর ঝরনার পানিতে ভাসতে দেখা যায়। তারা নিশ্চিত হয় আসিকে বাঘে খেয়েছে, আর মালজাকে জলের কুমির খেয়ে ফেলেছে। তাদের বিশ্বাস ওয়ানগালার নিয়ম কানুন তারা পালন করে নি, সাল নিমমার দিনে তারা কাজ করেছে। তাই মিৎদে বা দেবতা সালজং, বীজের মা মেয়ানমা রংকিমেমা ক্ষুব্ধ হয়ে বাঘকে নির্দেশ দেয় আসিকে মারার জন্যে, আর কুমিরকে নির্দেশ দেয় মালজাকে মারার জন্যে। তাই কামাল বা পুরোহিতেরা গ্রামের মান্যগণ্য ব্যক্তিরা সব সাংসারেক গারোদের সতর্ক করে দিয়ে বলে, তোমরা কেউ ওয়ানগালার নিয়ম-কানুন অমান্য করবে না, সাবধান হও। যদি কেউ নিয়ম অমান্য করো তাহলে আসি মালজার মতো মরতে হবে, এই আসি মালজা শব্দটিকে পরবর্তীতে গারো বয়স্ক লোকেরা বিকৃতি করে বলে আসি নামজানা। ছেলে মেয়েরা কোন খারাপ কাজ করতে চাইলে মা বাবারা অভিবাবকেরা বলে, ওটা করো না পরে আসি নামজা হবে। এভাবে ছেলে মেয়েদের খারাপ কাজ থেকে বিরত রাখে। আসি মালজা যখন ঘর থেকে জঙ্গলের পথ দিয়ে যায় তখন দওমা পাখি বারবার ডেকে তাদেরকে নাকি সতর্ক করেছিল, কিন্তু দওমা পাখির ডাক শুনেও তারা সতর্ক হয় নি, মানে নি। দওমা পাখির বাংলা নাম কি আমিও জানি না, এই পাখির ডাককে গারোরা এভাবে ব্যাখ্যা দেয়, গারো ভাষায় ওয়ে ওয়ে সিমসাকবো ইয়ানজক সববাংজকনে এভাবে দওমা পাখি ডাকে বলে। বাংলায় ওয়ে ওয়ে সতর্ক হও, সামনে আসছে বলে নাকি দওমা পাখি ডাকে। এখনো গারোরা দওমা পাখির ডাক শুনলে সতর্ক করলে আর সামনে যায় না, ফিরে আসে।


কোনদিন ওয়াননা বা ওয়ানগালা একই জায়গায় থাকে নি, মিৎদে বা দেবতার নাম একই নাম থেকেছে, কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা কার্যক্রম পরিবর্তন হয়েছে। পরিবর্তন মানে আরো বেড়েছে, যেমন আগে দশটি গান হতো, পরে বারটি হয়েছে, আগে বিশটি নাচ ছিল পরে পঁচিশটি হয়েছে, হয়ত আগে মিংআ চংআ বা মন্ত্র পড়া দশটি লাইন ছিল এখন বিশটি হয়েছে এরকম। গারোদের অনেক কথক বা গোত্র আছে, এই গোত্র ভেদে ওয়ানগালার ধরন গঠন আনুষ্ঠানিকতা একটু অন্যরকম হয়, আবার কোন কোন গোত্র হয়ত আগে ওয়ানগালা করেছে, পরে করে নি। বাংলাদেশে আদং গোত্রের লোকেরাও ওয়ানগালা করে না, তাদের কাছে জিজ্ঞেস করলে বলে, আমরা ওয়ানগালা করি না, চৌগান করি। আবার অনুষ্ঠান দেখলে, চৌগান দেখলে একেবারে মিমাং কাম বা শ্রাদ্ধ। এটা কোনভাবেই ওয়ানগালা বা নতুন ধানের নবান্ন অনুষ্ঠান নয়। আমি কিছু খরচ দিয়ে দু’টি জায়গায় চৌগান অনুষ্ঠান করিয়েছি, দেখেছি। দেখে শুনে বুঝে নিয়েছি, এটা আবেং গোত্রের মিমাং কাম, বাঙালিদের শ্রাদ্ধ। আদং গোত্রের চৌগান একটাই কোন পার্থক্য নেই, কিন্তু অনেক আদং গোত্রের লোকেরা বলে, আমাদের চৌগান ওয়ানগালা নয়। আগেই বলেছি, গারোদের সব গোত্রের ওয়ানগালা এক নয়, আনুষ্ঠানিকতা ভিন্নরকম। তাই একজনের ওয়ানগালার বিষয়-আশয় দেখে আর একজন বলবে এটা হয় নি। আবার তার নিয়মটাও আর একজন বলবে কোনমতেই ওয়ানগালা এরকম নয়, এরকম হতে পারে না, কোন গারো সব গোত্রের নিময় জানে না, তাই এরকম ইননা জিয়া বা সমালোচনা করে। কামাল বা পুরোহিতের মিংআ চংআ বা মন্ত্র পাঠ করাও কোনদিন একইরকম হয় নি, যেহেতু এই মন্ত্র লিখিত নয়, আর কামালেরা লিখতে পড়তে জানে না, তাই অনেক কামাল নিজের সুবিধা মতো তৈরি করে নেয়। এ কারণে একজন কামাল অন্যজন কামালের মিংআ চংআ বা মন্ত্র পাঠকে সমালোচনা করে, বলবে এই মন্ত্র হয় নি, শুধু মিৎদে বা দেবতার নাম ঠিক আছে। যেমন মিৎদে মিসি সালজং, মিৎদে মেয়ানমা রংকেমেমা এই নামগুলো আবার ঠিক আছে, মিৎদেদের জন্যে সামবা সিয়া বা আসন তৈরি করাও এক নয়, গোত্র ভেদে ভিন্ন হয়ে থাকে। (সমাপ্ত)

তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।

লেখাটি শেয়ার করুন...

Post a Comment

0 Comments