দামার বর্তমান কারিগর ‖ পরাগ রিছিল ‖ খু•রাং

চুনিয়ার সহিন মৃ সবার কাছে দামা আৎচু বলে পরিচিত ছিলেন। সহিন আৎচু যতদিন জীবিত ছিলেন ততদিন নিজের হাতে দামা বানিয়ে গারো সংস্কৃতির ক্ষেত্রে অনন্য অবদান রেখে গেছেন। তাঁর জীবিতকালে যাদেরই দামার প্রয়োজন পড়ত, সবাই ছুটে যেতেন সহিন আৎচুর কাছে। খুবই দুঃখের খবর যে, সহিন আৎচু আমাদের মাঝে আজ আর নেই! তবে কি হবে আমাদের দামার? কি হবে দামার ভবিষ্যৎ?


দামা
সহিন আৎচুর পর আজকের এ লেখায় সে-সবেরই হাল হকিকত। সহিন আৎচুর পর দায়িত্বশীলতার সাথে দামা বনানোর দায়িত্ব নিজের কাঁধে তুলে নেন এডিশন মৃ। এডিশন মৃ সম্পর্কে সহিন আৎচুর মেয়ে জামাই। ১৯৮৪ সালে হিরেন্দ্র নকরেক (হেড) ও সুবুনি মৃ’র পুত্র এডিশন নকরেক নয়াপাড়া থেকে বিয়ে করে উঠেছিলেন সহিন মৃ’র বাড়ি। সাধারণত নিজের ছেলেদের চাইতে জামাইয়ের দূরত্ব তো একটু বেশিই হয়। এডিশন মৃ’র বেলায় পার্থক্য তেমন একটা হলো না।

যদিও এডিশন মৃ’র পেশা দামা বানানো না। পেশা অন্য। এডিশন দেখতেন, শ্বশুরের সাথে আর দু’জন দামার কারিগর অনেক কষ্ট করে গাছের টুকরোতে দামার ভেতরের অংশ ফাঁকা করতে গাছ/কাঠে গর্ত খুঁড়ছেন। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের অনেক কষ্ট হতো; কারণ তাদের সবারই বয়স হয়ে গিয়েছিল। এডিশন কাজ শেখার আশায় তাঁদের সেসব কাজে সাহায্য করতেন, কাজ শেখার শুরুটা হয়েছিল এভাবেই। কোন পারিশ্রমিক নিতেন না। কেবল কাজ শেখার আগ্রহ থেকেই সেসব কাজ করতেন। চুনিয়ার নেবুল দারু অবশ্য সেসব কাজে খুব উৎসাহ যুগিয়েছিল, খুলে দিয়েছিল তাঁর অন্তর্দৃষ্টি। তিনি এডিশনকে বলেছিলেন, একদিন সহিন মৃ যখন থাকবেন না, তখন কে করবে এসব কাজ? কাউকে না কাউকে তো এ দায়িত্ব নিতেই হবে।

এডিশন মৃ ঠিকই নিয়েছেন সে দায়িত্ব। সহিন মৃ’র পর নিজ হাতে এখন দামা বানাচ্ছেন। আনুমানিক ২০ টির মতো নিজের হাতে বানানো দামা বিক্রি হয়েছে।

এডিশন মৃ। ছবি : পরাগ রিছিল।
শ্বশুরের সাথে আর দু’জন দামার কারিগর অনেক কষ্ট করে গাছের টুকরোতে দামার ভেতরের অংশ ফাঁকা করতে গাছ/কাঠে গর্ত খুঁড়ছেন। এ কাজ করতে গিয়ে তাদের অনেক কষ্ট হতো; কারণ তাদের সবারই বয়স হয়ে গিয়েছিল। এডিশন কাজ শেখার আশায় তাঁদের সেসব কাজে সাহায্য করতেন, কাজ শেখার শুরুটা হয়েছিল এভাবেই। কোন পারিশ্রমিক নিতেন না। কেবল কাজ শেখার আগ্রহ থেকেই সেসব কাজ করতেন। চুনিয়ার নেবুল দারু অবশ্য সেসব কাজে খুব উৎসাহ যুগিয়েছিল, খুলে দিয়েছিল তাঁর অন্তর্দৃষ্টি। তিনি এডিশনকে বলেছিলেন, একদিন সহিন মৃ যখন থাকবেন না, তখন কে করবে এসব কাজ? কাউকে না কাউকে তো এ দায়িত্ব নিতেই হবে।
কথায় কথায় জানালেন, এখন দামা তৈরির অসুবিধাগুলি। সঠিক সাইজের গাছ সহজে পাওয়া যায় না। অগ্রিম কাঠ ব্যবসায়ীদের কাছে জানিয়ে রাখতে হয়। ব্যবসায়ীরা সেফটি প্রতি দাম হাঁকে ৮০০-৯০০ টাকা। আর তার দরকার, সে তো গাছ কিনবেই, এ চিন্তা করে তার কাছে দাম হাঁকতে থাকে আরো বেশি। দামার দু’পাশে যে অংশে টোকা দেয়া হয়, তা ঢাকা হয় গরুর চামড়া দিয়ে। গরুর চামড়াও সহজলভ্য নয়। ব্যবসায়ীরা লবণ মাখানো যে চামড়া বাজারে বিক্রি করেন, তা দামা বানানোর জন্য ঠিক উপযুক্ত না। সেসব দিয়ে বানালে দামা তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যাবে। উপযুক্ত হচ্ছে লবণ না মাখানো টাটকা চামড়া। যার দাম পড়ে বেশি, সবসময় যোগাড় করা সম্ভবপরও হয়ে ওঠে না। আগে গাছ সহজে পাওয়া যেত, এখন সহজে পাওয়া যায় না। এসব নানামুখী বাস্তব সমস্যার কারণে আগে দামা বানাতে যেখানে খরচ পড়তো ১২,০০০-১৪,০০০ টাকা সেখানে এখন খরচ পড়ছে ১৬,০০০-১৮,০০০ টাকা। এডিশনের নিজের টাকা নেই গাছ-চামড়া কিনে, দামা কমপ্লিট করে বানিয়ে বিক্রি করার। তিনি অর্ডার পেলে এবং কাজ করার জন্য কেউ এডভান্স টাকা দিয়ে আসলে সে টাকা দিয়েই সবকিছু যোগাড় করে দামা তৈরি করে দেন। নিজের পারিশ্রমিক হিসেবে নেন কেবল ৫০০ টাকা। দুঃখ করে তিনি বলেন, যারা দামা কিনতে আসে তারা অনেকে এসব না জেনে বলেন, আগে দামা কম দামে কিনেছি, এখন কেন এত দাম? একটা দামা বানাতে কয়দিন সময় লাগে? তাঁদের টাকা দিয়ে আমি কেবল তাদের জন্য দামা বানিয়ে দেই। সব খরচ বাদে দামা প্রতি পারিশ্রমিক নেই কেবল ৫০০ টাকা।



দামার দু’পাশে যে অংশে টোকা দেয়া হয়, তা ঢাকা হয় গরুর চামড়া দিয়ে। গরুর চামড়াও সহজলভ্য নয়। ব্যবসায়ীরা লবণ মাখানো যে চামড়া বাজারে বিক্রি করেন, তা দামা বানানোর জন্য ঠিক উপযুক্ত না। সেসব দিয়ে বানালে দামা তাড়াতাড়ি ছিঁড়ে যাবে। উপযুক্ত হচ্ছে লবণ না মাখানো টাটকা চামড়া।

দামা বানালেও সংস্কৃতির এ গুরুত্বপূর্ণ উপাদান দামা তৈরিকে এখনো পেশা হিসাবে নিতে পারেন নি। আমাদের কি কোন দায়িত্ব নেই দামাকে বাঁচিয়ে রাখবার? ব্যতিক্রমী এ কাজকে পেশার মর্যাদা দিয়ে তুলবার?

পরাগ রিছিল ‖ কবি ও গবেষক


লেখাটি শেয়ার করুন...

Post a Comment

0 Comments