শিক্ষিত পাঁচালী ‖ হেমার্সন হাদিমা ‖ খু•রাং


গ্রামের অশিক্ষিত বা আধা শিক্ষিত মানুষ শিক্ষিত বা ভদ্রলোকের ভাষা বোঝে না। কোন ভদ্রলোক ভাল কথা বললেও সেটির অর্থ অন্যভাবে ধরে নেয়।

একবার এক স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠে যে, তিনি তার স্কুলেরই এক ছাত্রীর সাথে অবৈধ সম্পর্ক রাখছেন। মান্না নামের এক ব্যক্তি নাকি হাতে-নাতে দেখেছেন। এ মান্নাকে সাক্ষী মেনে শিক্ষকের বিরুদ্ধে বড় একটা দরবার ডেকেছে।

স্কুলের হল ভর্তি লোক। হল বলতে স্কুল ঘরেরই সবচেয়ে বড় রুমটাকে হল বানিয়েছে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় বসার আসন নেই। থানার শিক্ষা অফিসার এ দরবারে বিচার করবেন। তিনি যথা সময়েই এসে গেছেন। সাক্ষী মান্না একটু দেরি করে এসেছেন। তার তো সাক্ষী দিতে হবে। তিনি যে শিক্ষকের অশালীন আচরণটা দেখেছেন তার বিবরণ দেবেন। কিন্তু বসার মতো কোন জায়গা পাচ্ছেন না।

তার এ সমস্যা দেখে প্রধান শিক্ষক নিজে এগিয়ে গেলেন। মান্না যে বেঞ্চের কাছে দাঁড়িয়েছিলেন সে বেঞ্চে বসা একজনকে বললেন, এই যে ভাই, এ ভদ্রলোকটাকে বসতে দেন। একটু কষ্ট করে সরে বসুন।

লোকটা একটু সরে গিয়ে মান্নাকে বসতে জায়গা করে দিলেন। কিন্তু মান্না বসলেন না। মনে হলো, মান্না বেজার হয়েছেন। তিনি মুখ কালো করে বেরিয়ে গেলেন।

ওদিকে যারা অভিযোগ এনে আজকের দরবার ডেকেছে, তারা তাদের অভিযোগের স্বপক্ষে অর্থাৎ এ প্রধান শিক্ষকের চরিত্র যে খুব খারাপ সে সম্বন্ধে ফিরিস্তি দিলেন। দরবারে উপস্থিত শিক্ষিত অশিক্ষিত সব লোক তাদের এ অভিযোগ সত্য বলে জানতে পারল না। এ জন্য এক ব্যক্তি দাঁড়িয়ে বললেন, আপনাদের এ অভিযোগ খুবই সম্মান হানিকর। একজন শিক্ষিত মানুষ বিশেষত একটি স্কুলের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে এ প্রকার অপমানজনক নালিশ খুবই দুঃখজনক বটে। তবে আপনাদের এ অভিযোগের কোন সাক্ষ্য প্রমাণ যদি থাকে হাজির করুন।

এখানেই ঘটল বিপত্তি। অভিযোগকারী দল তাদের সাক্ষী মান্নাকে খুঁজে পেল না। ইতোমধ্যেই তিনি বাড়িতে চলে গেছেন। যাবার সময় পথে কয়েকজনকে নাকি বলে গেছেন, আমি মাস্টারের বিরুদ্ধে সাক্ষী দিতে যাওয়ায় মাস্টার আমাকে অপমান করেছে। আমি মুখ্য মানুষ সে আমাকে ভদ্রলোক বলে ঠাট্টা করেছে।

প্রত্যক্ষদর্শী কোন সাক্ষী না থাকায় এবং গ্রামের লোকদের সাফাই সাক্ষ্যে প্রধান শিক্ষক অভিযোগ থেকে রেহাই পেয়ে গেলেন। আসলে প্রধান শিক্ষক মান্নাকে ঠাট্টা করে ‘ভদ্রলোক’ বলেন নি। অথচ তিনি বুঝে গেছেন, তাকে ঠাট্টা করেই ‘ভদ্রলোক’ বলা হয়েছে।

আমাদের সমাজে শিক্ষিত বা অশিক্ষিত সব লোকের মধ্যেই ভুল বোঝাবুঝির খেলা হয়। কোন বিষয়কে পরিষ্কারভাবে না বুঝে নিজের বুঝ মতো কথা বললে বা কাজ করলে সমস্যা হয়। এ সমস্যা কখনো কখনো খুব মারত্মকও হয়।

২.
শহরের বড় রাস্তার পাশে দেয়াল ঘেরা অফিস ভবন। দেয়ালের গায়ে লেখা আছে, ‘এখানে প্র¯্রাব করিবেন না করিলে জরিমানা দিতে হইবে।’ এক ব্যক্তি প্র¯্রাবের জন্য জায়গা খুঁজে পাচ্ছে না। সে দেখল দেয়ালের লেখা। লেখাটা পড়ে লোকটা বুঝল, এখানেই প্র¯্রাব করতে বলা হয়েছে। যদি না করে, তবে তার জরিমানা হবে। ব্যস! সে ওই দেয়ালের দিকে মুখ করে প্র¯্রাব করল। তৎক্ষণাৎ সে অফিসের গেইটে কর্মরত দারোয়ান সেখানে হাজির হয়ে বলল, আপনি নিষেধ অমান্য করেছেন, জরিমানা দিন।
লোকটা বোঝাল, দেয়ালে লেখা আছে প্র¯্রাব না করলেই জরিমানা দিতে হবে। আমি তো প্র¯্রাব করেছি। জরিমানা দেব কেন?

৩.
সমাজে আরেক শ্রেণীর শিক্ষিতরা হচ্ছেন উচ্চ শিক্ষিত। সাধারণত যারা কলেজ ভার্সিটির পড়া উৎড়ে গেছেন তাদেরকে বলে উচ্চ শিক্ষিত। এ উচ্চদের মধ্যে যারা মাস্টার্স বা ডক্টরেট করেছেন তারা হচ্ছেন রাষ্ট্রে প্রথম শ্রেণীর নাগরিক। মাস্টার্স বা ডক্টরেটরা যদি প্রথম শ্রেণীর নাগরিক হন, তাহলে ব্যাচেলররা বোধহয় দ্বিতীয় শ্রেণীর। আর উচ্চ মাধ্যমিক পর্যন্তরা বোধহয় তৃতীয় শ্রেণীর। তাহলে যাদের পড়াশোনা নেই তারা নিশ্চয়ই চতুর্থ শ্রেণীর নাগরিক! আমাদের রাষ্ট্র কিন্তু বলে সকল নাগরিক সমান। অবশ্যই সমান। তবে, জ্ঞানে বুদ্ধিতে, ছলা কৌশলে সবাই সমান নয়। সমান নয় বলেই উঁচু শ্রেণীরা নিম্ম শ্রেণীদের ওপর কর্তত্ব করে। অশিক্ষিত বা আধা শিক্ষিতদের চেয়ে শিক্ষিত বা উচ্চ শিক্ষিতরা কূট কৌশল বেশি জানেন বলে তাদেরকেই সমাজের উঁচু আসন দেয়া থাকে। মধ্যযুগে ধর্মভিত্তিক সমাজ ব্যবস্থায় ধর্মকর্ম, যাগ যজ্ঞ, বিচার সালিশ এবং সমাজের সর্বস্তরের নীতি নির্ধারণের ক্ষমতা ছিল এ উঁচু শ্রেণীদের হাতে।

এখন যুগ পাল্টেছে। আধ্যাত্মিক নেতাদের উত্তরসূরি সমাজতান্ত্রিক (কম্যুনিস্ট) নেতাদের দাপটের যুগও শেষ হয়েছে। তৎস্থলে প্রতিস্থাপিত হয়েছে গণতন্ত্র নামক সমাজ ব্যবস্থা। সংখ্যাধিক্য জনগণ যা বলে, যা চায়, সেটাই মেনে নেয়াকে গণতন্ত্র বলে চালানো হয়। কিন্তু শতজনের একান্নজনই যা বলবে বা যা চাইবে সেটা তাদের জন্য কল্যাণকর নাও হতে পারে। হলে কি হবে, গণতন্ত্র বলে মানতেই হবে। আসলে শিক্ষিত, বিবেকবান, চিন্তাশীল জনগণের জন্যই গণতন্ত্র মঙ্গলজনক।

অনেক সময় দেখা যায়, জন সাধারণ তথাকথিত উচ্চ শিক্ষিত বা উঁচু শ্রেণীর কু-মতলব বুঝতে পারে না। নানা প্রলোভনে, নানা আশ্বাস ও নানা ভয় ভীতি প্রদর্শন করে উঁচুরা নিচুদের হাত করে নেয়। ফলে সৎ, বিশ্বাসী ও বিবেকবান বাকি জনগণ বিপদে পড়েন। কখনো কখনো ছোটখাটো বিবাদ, দ্বন্দ্ব থেকে বৃহত্তর সংঘাত বেঁধে যায়। তখন সেটি নিয়ন্ত্রণের জন্য বাইরের হস্তক্ষেপের প্রয়োজন হয়। ওই বাইরের পক্ষ হতে পারে ব্যক্তি, সংস্থা, সংগঠন, বা, আইন আদালত।

এখানেও শেষ হয় না। মধ্যস্থতাকারী ব্যক্তি সংগঠন বা আদালতে বিবাদ মীমাংসার জন্য যে ফর্মূলা দেয়া হয় সেটির অপব্যাখ্যা করেও তথাকথিত উঁচুরা নিচুদের প্রতারিত করে। তবে প্রতারণার আশ্রয় নিয়ে ছল চাতুরি করে আর যাই হোক নিচুদের বেশিদিন নাচানো যাবে না। এরূপ ক্ষেত্রে পরাজিত উঁচুদের পরিণাম খুব মারত্মক হয়, সে পরিণাম নিরাময় অযোগ্য, ভাইরাস এইচআইভির মতো জড়িয়ে ধরে ছড়িয়ে পড়ে।

হেমার্সন হাদিমা: লেখক।

Post a Comment

0 Comments