ওয়াননা বা ওয়ানগালা সাংসারেক গারোদের নবান্ন বা নতুন ধান পাওয়ার উৎসব। ওয়ানগালা উৎসবে মিৎদে বা দেবতা সালজংকে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়া হয়। সাংসারেক গারোরা সালজং দেবতাকে দয়ার দেবতা হিসেবে বেশি জানে, এ দেবতা গারোদের জন্য ধানের বীজ যেটাকে গারোরা ‘মিমা মিসি’ বলে; ‘মিমা’র বাংলা ধান, ‘মিসি’র বাংলা অন্য ধরনের ধানের বীজ দিয়েছিল। আর বলেছিল, এ ধান চাউল বানিয়ে খাওয়ার আগে আমাকে স্বরণ করে ‘অননি চিননে’ বা ভোগ দিয়ে তারপর তোমরা খাবে। এ জন্য সাংসারেক গারোরা নতুন ধান সাক-সবজি ফল-ফলান্তি দেবতা সালজংকে ভোগ দিয়ে তারপর খায়। এ মিৎদে বা দেবতা সালজংকে ভোগ দেওয়ার বা ওয়ানগালা অনুষ্ঠান সাধারণত অক্টোবর মাসে হয়।
“ওয়ানগালা একদিনে হয় না, কয়েকদিনে করে। এটা নির্ভর করে গ্রামে কতজন ধনী লোক আছে। যদি গ্রামে পাঁচটি ধনী পরিবার থাকে তাহলে একদিন করে পাঁচদিন হবে। এ পাঁচদিন ধনী বাড়িতে ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান করাকে সাংসারেক গারোরা ওয়াননা চাআ বা ওয়াননা খাওয়া বলে। শেষ দিন বড় ধরনের অনুষ্ঠান নকমা বা গ্রাম প্রধানের বাড়িতে হয়। শেষ দিন গ্রাম প্রধানের বাড়িতে যে অনুষ্ঠান হয় তাকে ওয়ানগালা বলে।”
সাংসারেক গারোরা অশিক্ষিত ছিল, তারা সেইসময়ে দিন-তারিখ গণনা করতে পারত না, তাদের কেলেন্ডার ছিল না। কিন্তু তারা প্রকৃতিকেই, বন-জঙ্গল গাছের ফুল-ফল এসবকেই কেলেন্ডার হিসেবে গণনা করত। এক ধরনের গাছ- গারোরা ‘মিগং’ নাম দিয়েছে, এ মিগং গাছের ফুল ফোটা শুরু হলে ওয়াননা ওয়ানগালা শুরু করে দিত। অবশ্যই পূর্ণিমার রাতে ওয়ানগালা হবে।
ওয়ানগালা একদিনে হয় না, কয়েকদিনে করে। এটা নির্ভর করে গ্রামে কতজন ধনী লোক আছে। যদি গ্রামে পাঁচটি ধনী পরিবার থাকে তাহলে একদিন করে পাঁচদিন হবে। এ পাঁচদিন ধনী বাড়িতে ঘুরে ঘুরে অনুষ্ঠান করাকে সাংসারেক গারোরা ওয়াননা চাআ বা ওয়াননা খাওয়া বলে। শেষ দিন বড় ধরনের অনুষ্ঠান নকমা বা গ্রাম প্রধানের বাড়িতে হয়। শেষ দিন গ্রাম প্রধানের বাড়িতে যে অনুষ্ঠান হয় তাকে ওয়ানগালা বলে। প্রথমে মিৎদে মিসি সালজংকে নতুন ধানের ভাত-তরকারি ও ফল-ফলান্তি ‘অননা চিননা’ বা ভোগ দেয়। এ সমস্ত কিছুই করে কামাল বা পুরোহিত। ভোগ দেওয়া শেষ হলে মিৎদে মিসি সালজংকে ডাকে গারো ভাষায় মিংয়ে চংয়ে ওকগামা, বা, মন্ত্র পাঠ করা, এসব সামবা সিয়া বা আসন তৈরি করে তার সামনে করা হয়। এ আসন পর্ব শেষ করে কামাল বা পুরোহিত ডান হাতে মিল্লাম বা তলোয়ার নেয়, বাম হাতে সিপপি বা ঢাল নিয়ে মিল্লাম আকাশে উঁচিয়ে ডান পা মাটিতে জোরে ঠেকায়। তারপর জোরে হুংকার দিয়ে নেচে নেচে মিল্লাম ঘুরিয়ে যুদ্ধের অভিনয় করে দেখায়। কামাল বা পুরোহিতের এ নাচকে গারোরা গ্রিকগা মেসা বলে। পরে সহকারী কামাল বা পুরোহিত একই কায়দায় নাচে। এ সামবা সিয়া বা আসন কি? এটি মড়াল বাঁশ, গারোরা বলে ওয়াগি অথবা মাঝারি তরই বাঁশ দিয়ে কারুকাজ করে তৈরি করা হয়। সাড়ে তিন হাত উঁচু করে সামবা সিয়া বা আসন তৈরি করে আসনের সামনে ভোগ দিয়ে সালজং মিৎদে বা দেবতাকে ডাকে। দেবতা যেন এসে এ-আসনে বিশ্রাম নেয় তার জন্যে ভোগ দেওয়া ভাত ফল ফলান্তি গ্রহণ করে, আসন তৈরির উদ্দেশ্য এটাই। আগে সাংসারেক গারোরা জুম চাষ করতে জানত না, তারা জঙ্গলে গিয়ে বন আলু তুলে সিদ্ধ করে খেত, যাকে গারোরা বলে থামা, থাজং, থা.ওয়েক, থাবিরং, স্টেং, আমবেং আরো অনেক রকমের বন আলু। মিৎদে মিসি সালজং বা শস্যের দেবতার ধান দেওয়ার আগে সাংসারেক গারোরা সারাদিন প্রতিদিন জংগলে বন আলু খুঁজে সকাল দুপুর বিকেলের খাবার সংগ্রহ করত। সাংসারেক গারোদের এত কষ্ট দেখে দয়া কর্তা মিৎদে বা দেবতা মিসি সালজং একজন বিধবা মহিলা, নাম আয়সে তার জন্যে ধানের বীজ দিয়ে সাহায্য করেছিল।
মিৎদে সালজংয়ের পরিচয়
সালজং দেবতাকে সাংসারেক গারোরা বড় সালজং মিসি বলে ডাকে। সালজংয়ের বাবার নাম রিকওয়া সানওয়া, মায়ের নাম প.ওক আনদক। মিৎদে মিসি সালজংয়ের আরেক নাম আবু রাচা ডেকবো গিৎদেল। তার আপন ভাগিনার নাম সিরিককা রাজিংগা বলে। মিৎদে সালজংয়ের আরো অন্য নামও আছে, যেমন মিসি চিপিনপা সালজং গালাপা, আবার অনেকে বলে মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা। এরকম আরো নাম থাকতে পারে। এ নামগুলো কি অঞ্চল ভেদে, গারোদের গোত্র ভেদে হয়েছে কিনা জানি না।
লেখাটি শেয়ার করুন...
তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।
লেখাটি শেয়ার করুন...



0 Comments