ওয়াননা ওয়ানগালা- দ্বিতীয় পর্ব ‖ তর্পণ ঘাগ্রা ‖ খু•রাং


প্রথম ওয়ানগালা

মিৎদে বা দেবতা সালজং ধানের বীজ হাতে নিয়ে আসে, তারপর মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা তার ছোট ভাই বামন রাচা সজন গিৎদেলের বাড়িতে যায়। সেই সময় বামন রাচা সজন গিৎদেল পেট ভরে ভাত খেতে না পেয়ে চরম কষ্ট ভোগ করছিল, মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা বামন রাচা সজন গিৎদেলের সাথে দেখা করতে যায়।

ছোট ভাইয়ের স্ত্রীকে দেখে মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা বলে, তোমার স্বামী বামন রাচা সজন গিৎদেলকে গিয়ে বলো, মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা তোমার সাথে দেখা করতে এসেছে।

বামন রাচা সজন গিৎদেলের স্ত্রী তার স্বামীকে গিয়ে বলে। স্বামী উত্তর দেয়, আমি পেট ভরে ভাত খেতে পারি না, ভাতের জন্যে আমি কষ্ট পাচ্ছি! স্ত্রী তার স্বামী বামন রাচা সজন গিৎদেলকে আরো জিজ্ঞেস করে, এখন কি রান্না করে মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপাকে খাওয়াবো বলে দাও।

বামন রাচা সজন গিৎদেল তার স্ত্রীকে বলে দেয়, শুকনো গরুর মল বা গোবরকে মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপার সামনে পুড়ে ধোঁয়া খাইয়ে দাও।

এভাবে বামন রাচা সজন গিৎদেলের স্ত্রী স্বামীর কথা মতো শুকনো গোবর মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপার সামনে জমা করে আগুনে পুড়ে দেয়, সঙ্গে সঙ্গে গোবরের খারাপ গন্ধ ও ধোঁয়া চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে। মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা রাগ করে বামন রাচা সজন গিৎদেলকে গালিগালাজ দেয়, তোমার জন্যে ভাতের দরকার নেই বলে সে জায়গা ত্যাগ করে।

“জমির পাকা ফসল কাটা মাড়াই শেষ হলে, প্রত্যেক পরিবার ঘর-বাড়ি উঠোন আশেপাশের সবকিছুই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার রাস্তা ঝরনার ঘাটের রাস্তাও পরিষ্কার করে। সব কাজ শেষ হলে, নতুন জামা কাপড় কেনা শেষ হলে, নকমা লোকদের সামনে ওয়ানগালার দিন তারিখ ঘোষণা করে।”

এভাবে মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা পৃথিবীতে আসে সাংসারেক গারো গ্রামে যায়, সে বিধবা মহিলা আয়সে ও তার পুত্র পিতৃহীন দৎদির উঠোনে গিয়ে ওঠে। বিধবা আয়সে মহিলা ও তার পুত্র দৎদি খুবই গরীব ছিল, মা ছেলে ঘর তৈরি করে কলাপাতা দিয়ে উপরে ছানি দিয়েছিল, গাছের লতাপাতা দিয়ে ঘরের বেড়া বেঁধেছিল। তারা কোনদিন পাত্র ভরে বন আলু সিদ্ধ করতে পারে নি, কোনদিন পেট ভরে খাবার খেতে পারে নি, মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপাকে তারা মা ছেলে কেউই চিনে না। কিন্তু তারা মা ছেলে খুবই ভাল ছিল, পবিত্র মনের মানুষ ছিল, কারো সাথে কোনদিন ঝগড়াঝাঁটি করে নি, মারামারি কাটাকাটির মধ্যে তারা নেই।

মিসি সালজং আয়সে বিধবা মহিলাকে বলে, তোমার বাড়িতে আমি রাত্রি যাপন করব আর বিশ্রাম নেব।

আয়সে বিধবা মহিলা চিন্তা করে, বড় লোক ধনী লোক এসে পড়েছে! সে লজ্জা পায় আর উত্তর দেয়, আমার ঘর ভাল না, কলাপাতা দিয়ে ও গাছের লতাপাতা দিয়ে ঘর বানিয়েছি। কোনদিন আমরা মা ছেলে পেট ভরে খেতে পাই নি, তোমাকে কোথায় থাকতে দেব, কি খেতে দেব, আমি ভেবে পাচ্ছি না, আমাদের মতো গরীবের ঘরে কেন এলেন?


মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা উত্তর দেয়, তোমাদের ভাল ঘর-বাড়ি নেই, ঘুমানোর ভাল বিছানা নেই, কোনদিন পেট ভরে খেতে পাওনা, কিন্তু তোমাদের মন অনেক বড় অনেক ধনী। আমি তোমাদের ঘরেই থাকব, আমাকে ভাল ভাল খাবার খাওয়াতে হবে না, ভাল সুন্দর কাপড় দিয়ে বিছানা করে দিতে হবে না, তোমার হাতে যে আগর গাছের শুকনো রস আছে, আর গাছের রসের শুকনো ধোপ আছে গারোরা এটাকে নাম দিয়েছে ‘বল চাচাত’, সেগুলো আগুনে পুড়ে ধোঁয়া বানিয়ে চারিদিকে ছড়িয়ে দাও, সুমিষ্ট গন্ধে ছড়িয়ে দাও, আমি ধোঁয়াটি খাব। এভাবে বিধবা আয়সে মহিলা মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপাকে থাকার জায়গা করে দেয়, আর আগর গাছের শুকনো সুগন্ধি রস বা ধোপ তার সামনে রেখে আগুনে পুড়িয়ে দেয়। চারিদিকে কালো সুগন্ধি ধোঁয়া ছড়িয়ে পড়ে, সুগন্ধি ধোঁয়া পেয়ে মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা খুশি হয়, মন ভরে যায়, আর ভাল মনে বিধবা মহিলা আয়সেকে বলে, সত্যি এখানে জিজ্ঞেস করে আলাপ করেও ভাল লাগল, এখানেই ধানের বীজ ও অন্যান্য বীজ দেওয়া যায়। এভাবে বিধবা আয়সে ও তার ছেলে দৎদির জন্যে অনেক ফসলের বীজ দেয়। আর মিসি চিপিনপা সালজং নাদাংপা আশীর্বাদ দিয়ে বলে, আমি আবার ফসল কাটার সময় আসবো, তোমরা ধান থেকে চাউল বানিয়ে সিদ্ধ করে ভাত খাও, সালজংয়ের দেওয়া ফসল খাও। আমার জন্যে সুগন্ধি ধোপের ধোঁয়া দেবে, ফলানো ফসল আগে দেবে, তারপর তোমরা খাবে, কেউ যেন নিয়মের ব্যতিক্রম না করে। তখন থেকে সাংসারেক গারোরা নতুন পাকা ধান কেটে নিজেরা খাওয়ার আগে সুগন্ধি ধোপ জ্বালিয়ে নতুন ফসল মিৎদে বা দেবতা সালজংকে ‘অননি চিননে’ বা ভোগ দিয়ে ওয়ানগালা অনুষ্ঠান করে। পরে সাংসারেক গারোরা নিজেরা ভাত মাংশ চু বা মদ খেয়ে নেচে গেয়ে আনন্দ ফুর্তি করে এভাবে নবান্ন অনুষ্ঠান পালন করে।

ওয়ানগালার একদিন আগে নকমা নিজে ঝরনায় যায়। রংকিমে.মানা বা ফসলের মা’কে খবর দেওয়ার জন্যে পাঠায়। সেই দিন কোন সাংসারেক গারো কাজ করবে না। কোন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতেও যাবে না, নিজের বাড়িতে বসে ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিয়ে দিন শেষ করবে। এটাকে গারোরা ‘সাল নিমমা’ বলে।

আসল সাংসারেক গারোদের বর্তমান ওয়ানগালা একটু অন্যরকমভাবে দেখা যায়, সাংসারেকদের ওয়ানগালায় সবসময় তিনটি অংশ দেখা যায়— ১. রোগালা ২. চাচাত সওয়া ৩. ক্রাম গগাতা বা জল ওয়াৎদা। ওয়ানগালা বা নবান্ন অনুষ্ঠান গ্রামের সবাই ফসল কাটা শেষ করার পর পালন করে। ফসল লাগানোর সময়ও সাংসারেক গারোরা প্রথমে জমির কিনারে চারিদিকে ফসল বুনে, সবার শেষে জমির মাঝখানে ফসল লাগায়। এই মাঝখানের জমিতে কোন পশু-পাখি সহজে খায় না বা নষ্ট করে না, সবসময় পবিত্র থাকে। তাই ফসল পাকার পর নকমা নিজে সেই মাঝখানের পাকা ধান কাটে, চাউল বানায়, রান্না করে দেবতার জন্যে চু বা মদ তৈরি করে। যতদিন প্রস্তুত হবে না ততদিন ওয়ানগালা শুরু করবে না। শুধু নকমা নয়, গ্রামের প্রত্যেক ধনী পরিবার একইভাবে সর্বপ্রথম জমির মাঝখানের ধান কেটে চাউল বানিয়ে মিৎদে বা দেবতার জন্যে চু বা মদ তৈরি করবে। এই সকল কাজ নকমার সাথে একই সময়ে করে। পরে জমির পাকা ফসল কাটা মাড়াই শেষ হলে, প্রত্যেক পরিবার ঘর-বাড়ি উঠোন আশেপাশের সবকিছুই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যাওয়ার রাস্তা ঝরনার ঘাটের রাস্তাও পরিষ্কার করে। সব কাজ শেষ হলে, নতুন জামা কাপড় কেনা শেষ হলে, নকমা লোকদের সামনে ওয়ানগালার দিন তারিখ ঘোষণা করে। ওয়ানগালার একদিন আগে নকমা নিজে ঝরনায় যায়। রংকিমে.মানা বা ফসলের মা’কে খবর দেওয়ার জন্যে পাঠায়। সেই দিন কোন সাংসারেক গারো কাজ করবে না। কোন আত্মীয়-স্বজন বন্ধু-বান্ধবের বাড়িতে বেড়াতেও যাবে না, নিজের বাড়িতে বসে ঘুমিয়ে বিশ্রাম নিয়ে দিন শেষ করবে। এটাকে গারোরা ‘সাল নিমমা’ বলে।

তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।

লেখাটি শেয়ার করুন...

Post a Comment

0 Comments