ক্ষুধা ‖ লেবিসন স্কু ‖ খু•রাং


লেবিসন স্কু

কোনমতে বুকের ওপর আর নাভীর নিচে কাপড়টা ঢেকে রাখে। বেখেয়ালী হয়ে নিজের অজান্তে, আপন মনে, শরীরে সাবানের ফেনা তুলছিল সখিনা। কে জানে হতচ্ছাড়া রাখালের বাচ্চা রাখাল শিকারী বাঘের মতো সাড়া শব্দহীন ভাঁটঝোপের আড়ালে বসে মায়ের বয়েসী মহিলার গোসল দেখবে। ছেলেটারও বা কি দোষ! দুপুরে গরুর পাল তৃষ্ণা মেটাতে ছুটে আসে সুন্দরীঘাটে। গরুর পালের সাথে গান গাইতে গাইতে আসে রাখাল দল। আজ রাখাল দল নয়, কামাল একা, তার কণ্ঠেও নেই কোন গান। এই হলো শনির মূল কারণ। পাশের পাড়ার ছেলে হলেও বিধবা মায়ের সাথে ভাব থাকায় ছোটকাল থেকে মাঝে মাঝে কোলেপিঠে নিয়ে বড় করার অংশীদার হয়েছেন সখিনা। এখন বয়স ২৪। বাপ মরা ছেলে  কামাল। বছর মাফিক এ-গেরস্থি ও-গেরস্থিতে রাখালগিরী করেই দিন কাটে। বছর শেষে গেরস্থ যা দেই সেটা মা সাইমা সুদে কাটায় পাশের গারো পাড়ায়। কোন সময় থেকে গোসল দেখছিল কে জানে, ছেলেপুলে ভাবলেও তো বয়স ২৪। বয়সের দোষেই দোষী। আজ কালের ছেলের কাছে আপন মা বোন ছাড়া সবাই যেন তাদের অধিকারে এটাই ভাবে! সখিনা জোরে হাক দেয়- এই পুলা এই তোর কি গলায় হাক ডাক নাই, লজ্জা শরম নাই নি? মায়ের বয়সী মহিলার গোছল চুপি চুপি দেখছস, রাখ বিহানবেলা আইতাসি মায়ের কাছে; কত বড় পুংটা! বাইর করতাছি। কামাল গলার স্বর নামিয়ে বলে- না কালা কিসু তো দেহি নাই, গরুগুলান পানি খাওয়াইটাসি আর কি! গরুর পালে হাক দিয়ে তাড়াতাড়ি ঘাট ত্যাগ করে। গলায় টান দিয়ে গান ধরে কামাল- সোনা বন্ধুরে কই ছিলিরে, দিনে রাইতে তোরে খুঁইজা মরি রে... আমার সোনা বন্ধুরে...! এদিকে সখিনা রাগে ঘুট ঘুট করে...  দেখস নি গান বাইর অইছে পুলার, কত বড় পুংটা পুলাটা... এমনিতেই মাতব্বর করিম শেখ শাসিয়ে গেছে... চেংরা পুলাপাইন নষ্ট হইতাছে সখিনা... বালা হইয়া যাও, পাড়ার হকল লোক কিন্তুু খেপছে আমার বন্ধুর মাইয়া বইলা কেউ সাহস পাইতাসে না। সখিনা শরীরে কাপড় পেচিয়ে ঘরের দিকে রওনা দেয়। সূর্য পশ্চিমাকাশে বাঁশঝাড়ে ঠেকেছে। দুই আড়াই ঘণ্টার মধ্যে ডুবে যাবে। কাপড় শুকিয়ে ঘরে ঢোকে সখিনা। কাল থেকে মুখে দানা পানি ঢুকে নি। ক্লান্ত শরীর ভাঙা কাটে হেলিয়ে দেয় সখিনা। ৩৭ বছরে এসে পুরোনো জীবনের প্রতিচ্ছবি ভেসে ওঠে। ভালই কাটছিল সংসার জীবন রতনের সাথে। পাড়া থেকে পাড়া কাঁচাকলা সংগ্রহ করে পাকিয়ে শনি, বুধবারে বরুয়াকোনা বাজার; রবি, মঙ্গলবার গোবিন্দপুর বাজার এবং সোম, শুক্রবার বাউশাম বাজারে নিয়ে যেত। সপ্তাহের ৬ দিন বাজারে বাজারে থাকত। ভালই চলছিল রতন-সখিনার জীবন সংসার। একদিন সংসারে ঝড় এল ছাগল ব্যবসায়ীর ছাগল পালের সাথে। বৃষ্টির কারণে ছাগল পাল নিয়ে ব্যবসায়ী ঢুকেছিল সখিনার ঘরে। সেখান থেকে সংসার ভাঙন শুরু। একথা সেকথা করে পাড়াশুদ্ধ রটে গেল কু-কথা। হাজার বিনয়-অনুনয়-অনুরোধ বিচার শালিস এমনি কি ব্যবসায়ীর আত্মস্বীকার করেও সংসার টিকে নি। সে থেকেই বাপ মা মরা খালি ভিটাই সখিনা চেষ্টা করেছে ভাল হতে কিন্তু পারে নি। পাশের পাড়ার গারো মহিলাদের সাথে জমি জিরাতে ধান লাগিয়েছে, ধান কেটেছে। সেখানেও লোকের কু-নজর বলাবলি। অথচ গারো পুরুষ-মহিলা এক কাতারে কাজ করছে, তাদের বেলায় কিচ্ছু হচ্ছে না, বাঙালি মহিলা কাজ করলেই দোষ। তার যে পেট আছে, পেটে ক্ষুধা আছে, শরীরে কাপড় লাগে এটা দেখার সমাজের চোখ নেই। সমাজ যেন কালা বধির, কেউ খোঁচা দিলেই শুনে কু-কথার মন্ত্রধ্বনি। দরজায় ঠক ঠক আওয়াজ শুনে জেগে ওঠে সখিনা। চারদিকে ঝিঁঝির ডাক আর উত্তরে হাজং পাড়ার কুকুরের ঘেউ ঘেউ ছাড়া কিছুই শোনা যাচ্ছে না। সখিনা মনতাজ ভেবে দরজা খুলে। দরজা খুলে আটকে ওঠে সখিনা! দুপুরের উলঙ্গ শরীর দেখা কামাল। গামছা বাঁধা তিন-চার সের খানেক চাল নিয়ে কথা নেই আওয়াজ নেই হরহর করে ঘরের ভেতর ঢুকে যায় ক্ষুধিত রাখাল। সখিনা দরজা বন্ধ করে দেয়। বিছানার একপাশে খেলা শেষ করে সন্ধ্যার কোন এক ফাঁকে দরজার গিট লাগিয়ে মায়ের পাশে ঘুমিয়ে পড়েছিল টের পাই নি মা। ৮ বছরের মেয়ের দিকে চোখ যায় একবার আর অন্য দিকে গামছা বাঁধা চালের পুটলীতে চোখ যায় সখিনার। হঠাৎ পাশের বাড়ির জমিলার চিৎকার শোনা যায়। তোমার ছেলে পুলে জমি জিরতে গুষ্ঠি মারি, পাসটা বসর আধমরা বাজানরে দেহি না, তুই আমারে কোওয়াড়ে বড়ে রাকছস... গেলাম মুন্সিপুর। বউ ও-বউ বহুত রাইত হইসে তো বলে হাক দিয়ে দৌড় দেয় আফজাল শেখ। কামালের নাভীর নিচের ক্ষুধা, সখিনার নাভীর উপরের ক্ষুধা, জমিলার পেটের উপরের ক্ষুধার আত্মচিৎকারে রাতের গভীরতা হু হু করে বেড়ে ওঠে...

Post a Comment

0 Comments