গল্প ‖ দলছুট ‖ লেবিসন স্কু ‖ খু•রাং

খাংখি মাগি, গারোর বাচ্চা গরু, হারামজাদি! বাপের জমি জিরাট তো একখ-ও পাইলা না। বাপে দয়া মড়ল! বেটি বাঙ্গাল বিয়া করসে জমি দিমু কে? বেবাক জমি দান করসে ইস্কুলের নামে; দানওয়ালা বিদ্যাসাগর হইসে! যা বাগ... পাশের জঙ্গলে ১০ টাহা করে সিরিয়াল দেগা। বাউসাম বাজার তেহে রাইতে বাড়ি যাউন কাস্টমার মেলা পাইবা। গারিমারা দেগা গিয়া। সহাল বিহালের খাউন তো জুটব... গালি দিয়ে এতক্ষণ গলা চেপে ধরে শেষে টলপেটে লাট্টি দিয়ে ঘর থেকে বের করে ফাতেমাকে মফিজুল। আল্লাগো মায়াগো চিৎকারে কান্নায় এক বছরের ছেলে মহিদুল শিশুকে বগলে চেপে কোন মতে প্রাণে বাঁচে ঘরের অদূরে অমর ঝোঁপে লুকিয়ে থাকে। ফাতেমার এ দশা এই প্রথম না। সপ্তাহে চলে ২ থেকে ৩ দিন। শ্বশুর-শাশুড়ি, শালা-শালী সবার ভূমিকা এক। শুরুতে কেউ কেউ বাঁধা দিত, কিন্তু, এখন সবাই নীরব। সহ্য করে থাকা ছাড়া কোন পথ নেই ফাতেমার। বাবা-মা ভাই-বোন পাড়া-প্রতিবেশী নিষেধ করার পরও জাত ছেড়ে একদিন মনের মানুষ, ভালবাসার মানুষের হাত ধরে কবুল কলেমা পড়ে প্রীতিলতা থেকে ফাতেমা বেগম হয়। মফিজের বউ আছে জেনেও আপত্তি করতে পারে নি। কারণ কেউ কাউকে এমন ভালবাসতে পারে ফাতেমা কখনও দেখে নি। বাঁধা-বিপত্তি, বিচার-সালিশ, হাজার অপমান সহ্য করে স্কুলে যাওয়ার পথে দিনের পর দিন বসে থাকা। গোপনে স্কুলের খরচ থেকে এমন কি পারিবারিক হালকা-পাতলা খরচ বহন করা, এ যেন আজন্ম দায়িত্ব। সমস্ত কাজে দায়িত্ব নেওয়ার ফলে দুর্বলতা থেকে আপন হওয়া। কে জানত মফিজুলের ভালবাসা আত্মকেন্দ্রীক! ফলের সমস্ত রস চুষে খেয়ে, রসহীন চুপসে যাওয়া ফল ফেলে দিবে অনায়াসে। এ দায় কার? কে দেবে সুরাহা! এ সমাজ, না, ও সমাজ। আর কত দিন সহ্য করবে শারিরীক-মানসিক নির্যাতন ফাতেমা। নিজ থেকে অনুতপ্ত মনে সান্ত¦না খোঁজা ছাড়া আর পথ নেই ফাতেমার। কারণ তিন সন্তানের মা হয়ে পালিয়ে যাওয়া সহজ নয়, পালিয়েছেও কয়েকবার, কোন লাভ হয় নি। দেশের এক কোণে লুকিয়ে থাকলেও কুণো ব্যাঙের মতো পা টেনে বের করে ছেড়েছে। তারপর নির্যাতনের মাত্রা আরও বৃদ্ধি পেত। লাভ কি পালিয়ে, সহ্য করে থাকাই ভাল, নির্যাতনের মাত্রা তো কিছু কমবে। রাত ১২টার বেশি হতে পারে কম হবে না। পাড়ার মানুষজন ঘুমিয়ে পড়েছে। নিশ্চুই মফিজুল ঘুমিয়ে পড়বে। বাড়ির আওয়াজ নিঃস্তব্দ হলে ঘুমন্ত শিশুকে নিয়ে অসহায় বেড়ালের মতো ঝোঁপের আড়াল থেকে চুপি চুপি পা বাড়ায় ফাতেমা। মিশ মিশে অন্ধকার রাত হঠাৎ কলা গাছের আড়াল থেকে বাদুড় উড়ে যায়, পা আটকে উঠে; বাড়ির আঙিনায় এলে কারো সাড়া পায় ফাতেমা। পেছনের শাড়ির আঁচলে হাত পড়ে ভয়ে বুক ধুক ধুক করে ঘাম ঝরতে থাকে ফাতেমার! আঁচল টেনে ফিস ফিস করে কানের কাছে মুখ এনে বলে, ডর নাই বুবু... আমি রহিমা, ভাইজান ঘুমাইয়া পড়সে দুয়ার আর কুলব না, আমার ঘরে চল- তোমার দেওর ঘরে নাই, যাত্রাপালা দেহনের লাইগা মেদিকান্দা গেসে, আইজকা ফিরব না মনে হয়। হাইনজা হওয়ার আগে উঠলেই অইব। আঁচল টেনে হাঁস-মুরগী কাঁচায় ভরার মতো ফাতেমাকে ঘরে ঢোকায় রহিমা। বাতি জ্বালানো ছাড়াই কোন মতে বিছানায় বাচ্চাকে নিয়ে গা হেলাই ফাতেমা। খাইসিলা কিসু বুবু? জিজ্ঞাসা করে রহিমা। ফাতেমা উত্তর দেয়, না খাউন লাগব না। এহন খাউন গলা দিয়া নামব না। আমার মাইজা পুলারে দেখস? হ কিসুখন এদিক-সেদিক খুঁইজা শুইয়া পড়সে মনে হয়। আমি ডাকসিলাম ভাইজানের ডরে আয়ে নাই। আর কত দিন থাকবা এইরহম বুবু ? আমি যেদিন থাইকা আইছি সেদিন থাইকা দেখছি তোমার উপর অইত্যাচার। আমিও তো তোমার মতো ঘরের মানুষ না। তোমার দেওর সাবধান করে দিসে ভাইজানের সংসারে নাকগলাইতে যাইও না, ভাইজান সুবিধার না। তুমি বাপের বাড়ি চইলা যাইতে পার না? দীর্ঘশ্বাস ফেলে ফাতেমা বলে, না রহিমা, যাওনের পথ নাই। সইব পথই বন্ধ। কেন বুবু, পথ বন্ধ অইব কেন? তুমি বুঝবা না রহিমা! বেজাত থেকে জাতে আইসি, কম বড় কথা। বাপে আমার ইস্কুল মাস্টার। নরম মনের খাঁটি মানুষ। তোমার ভাইজান আমার পিছু পিছু করত দেইখা আমগো শ্বশুর আর তোমার ভাইজানরে বাসায় ডাইকা কত সুন্দর কইরা বুঝাইয়া দিসে একটা গাল-মন্দ করে নাই। আর আজকে এই পোলা মফিজুল, তোমার ভাইজান; পরের দিনের সকাল ১০টার আগেই মনগড়া ইস্কুলের রাস্তায় দাঁড়াইয়া থাকে। ছাত্ররা কত দৌড়ানি দিসে। লেজ তুইলা দৌড় দিয়া পরের দিন আবার হাজির! কই দিন সইহ্য করমু আমি। বরফ বাতাস পাইলে গলে, মোমও তাপ পাইলে গলে আমি তো মানুষ না গইলা থাকমু কই দিন? তোমার ভাইজানের সাথে পলাইয়া গেসি মড্ডিনগর হিন্দু পাড়া। সেহান থেইকা ধইরা আইনা বাপে গায়ে একটা ফুলের আঁচড়ও দেই নাই; কত সুন্দর কইরা বুঝাইসে- দেখ প্রীতি, তুমি আমাদের একমাত্র সন্তান। ছেলেও না, মেয়ে সন্তান। আমাদের প্রথা অনুযায়ী সম্পত্তির ভাগিদার তুমিই হইবা। তোমার জন্য তোমার মামির ছেলে সেঙরাগকে মোটামুটি সম্বন্ধ করে রেখেছি। তুমি উল্টা-পাল্টা করলে সমাজে কিভাবে মুখ দেখাব। আর গারো জাতির মাতৃপ্রথা হিসেবে তোমার দ্বারা জাতির বংশ বাড়বে, তোমার দু’ঠোঁটের ভাষায়, ভাষার আরেকটা প্রজন্ম তথা সংস্কৃতি জীবন্ত থাকবে। আর তুমিই যদি এভাবে হারাতে চাও তাহলে আমরা বাঁচবো কি করে? শোনো মা প্রীতি, তোমার আর মফিজুলের মধ্যে আবেগ কাজ করছে। মফিজুলের সমাজে তোমার চেয়ে অনেক সুদর্শনা মেয়ে আছে। আবেগ ফুরালে সেদিকে মফিজুল ছুটবে। তুমি তাকে ফেরাতে পারবে না।  কারণ সেই যোগ্যতা তোমার হয় নি। তোমার পরিবেশ আর ওর বেড়ে ওঠার পরিবেশ সম্পূর্ণ আলাদা। তুমি যা খেয়ে বড় হয়ে এসেছ তা সে কোনদিন খায় নি। তোমার যে পোশাক তার সমাজ তা মেনে নেবে না। তোমার  যে ভাষা তারা তা শুনবে না, বুঝবে না। জীবনের এক সময় নিজেকে মৃত মনে হবে। শোন মা, মফিজুল দোষের কিছু করে নি, তুমিও না। মানুষ হিসেবে তোমাদের চাওয়া-পাওয়া অধিকার সম্মত। সৃষ্টিকর্তা বৈচিত্রতার খাতিরে গোত্র সৃষ্টি করেছে। যা এক অদৃশ্য দেওয়াল। কালো-সাদা, উঁচু-নিচুতে ছড়ান। দেখ বনের অবুঝ পশুদের সিংহ আর বাঘ একই বনে বাস করলেও এক সাথে থাকে না। মাঠে কোন রাখাল গরু-মহিষকে এক পালে ছেড়ে দিলেও নিজেরা ঘাস খায় গরু গরুর পালে মহিষ মহিষের পালে। কিংবা, দেখ, কবুতর আর ঘুঘু সাদৃশ্য পাখি হলেও তাদের বিচরণও আলাদা। অথচ তাদেরকে কেউ বলে দেয় নি এ দলে আসো ওই দলে যেও না। আমরা প্রাকৃতিকভাবেই সাম্প্রদায়িক। আমাদের সমাজে অসাম্প্রদায়িক বলে বুলি ছোড়ে যারা আজন্ম মিথ্যেবাদী। কিন্তুু মানুষ হিসেবে অসাম্প্রদায়িক হওয়া উচিত। বৈচিত্রের দোহাই আমরা পারি না, করি না। প্রকৃতি আমাদের ভালবাসার অধিকার দিয়েছে প্রেমের অধিকার দেয় নি! কিন্তু, আমি বাপজানের এ সুন্দর উপদেশগুলো শুনি নাই। মাইমেনসিং হোস্টেল থেহে পলাই আইসি। বোকারাম সেঙরাগও আমার দশা চাইয়া চাইয়া দেখসে। ও আগাইয়া আসলে এমনদা নাও হইবার পারত। কেন আমারে শুধু তোমার ভাইজান মাইন্না নেই না ভাবস? কোন সমাস মাইন্না নেই নাই। না গারো, না বাঙ্গাল। সেই দিন দক্ষিণ পাড়ার জহুর মুন্সির ৩০ বসরের দামড়া পুলা কই- ‘গারো বারো জাইট্টা দরমো পাগারো, দশ মাসের পরে পেটে উঠলে বিষ, নানিরে খবর দিস।’ আর গত সপ্তাহে গোবিন্দপুর থেইকা কালার বাড়িত থেইকা আউনের সময় বামণগাঁওয়ের গয়রামের চুরা পুলা কই-‘ঢং ঢং বাজালে আসে নাহি বাঙ্গালে, খাই কি শুটকি মফিজের বউ মুটকি, ধোয়ায় না পুটকি।’ ছি ছি এইদা একদা কথা। মায়ের সুমান বেদি লগে বিটলামী! ৯৬ সালে এক বিহাল বেলা বিশ্বন্নাথপুরে দুইদা দইলচ্যুত পাহাইড়া বনের মইষ আইসিল। একদা খালেক মেম্বারের জঙ্গলে ঢুকসিল, পুলিস বন্দুক দিয়া গুলি করে মারসে, অন্যদা পাড়ার এক উধানে লাল পেটিকুট লারা দেইখা গুটা দিয়া শিংগ বাইজা কোয়ার মইধ্যে পইড়া মরসে। হেইদা অইলামগিয়া আমি! কবে কোন কোয়াই পইরা মরমো কেউ খোস পাইব না...এদিকে রহিমার নাক ডাকার আওয়াজ শোনা যায় নিশ্চুই অনেক আগেই ঘুমিয়ে পড়েছে। তার মানে ফাতেমা দীর্ঘক্ষণ একাই প্রলাপ বকেছে রহিমা শুনে নি...? তার দুঃখের আখ্যান শুনতে কেউ জেগে নেই! প্রতি রাতের এ আখ্যান ফাতেমার বাঁচার ইচ্ছাকে ক্ষীণ করে... চিৎ হয়ে শুয়ে থাকা ফাতেমার দু’গাল বেয়ে চিবুক দিয়ে চোখের জল নেমে যায় দু’বুকের মাঝ বরাবর... অন্যদিকে আব্বাস মুন্সির আযান দেওয়ার জন্য অজুর করা জলের আওয়াজ ফাতেমার বেঁচে থাকার বাণী শোনায়...

গল্পটি শেয়ার করুন...

Post a Comment

0 Comments