দ্বিতীয় দিন : চাচাৎনি সাল
চাচাৎ’র দিন- চাচাৎ বা ধোপ আগুনে পুড়ে ধোঁয়া বানিয়ে পালন করার দিন। রোগালার পরের দিন, চাচাৎ বা ধোপ জ্বালিয়ে ধোঁয়া দেওয়ার পর্ব হয়। সকালে নিজ নিজ বাড়িতে খেয়ে গ্রামের সবাই নকমার বাড়িতে চলে যায়। সবাই উপস্থিত হলে ধোপ পোড়ানো বা চাচাৎ সওয়া পর্ব আরম্ভ হয়। প্রথমে নকমার বাড়ির ভেতর রান্না করা ভাত ছড়িয়ে-ছিটিয়ে ফেলবে। রান্না করা ভাত ছিটানো মানে বছরের প্রথমে যখন প্রথম বৃষ্টি হবে তখন যেন এই রান্না ভাত ছিটানোর মতো শিলা বৃষ্টি হয়। শিলা বৃষ্টির প্রতীক হিসেবে রান্না ভাত ফেলা হয়। এ সময়ে নকমা নিজে জোরে জোরে বলবে, ঠিক সময়ে, সময় মতো যেন বৃষ্টি হয়, শিলা পড়ে পৃথিবীর মাটি যেন ভিজে। গারো ভাষায় আমাং জাংগি সিকগেৎবো, সময় মতো যেন ফসল বোনা যায় এই কামনা। পরে নকমা চাচাৎ নিয়ে চুলার আগুনে পুড়ে সারা ঘর ধোঁয়ায় ভরিয়ে দেবে। প্রচুর ধোঁয়া ঘরের চালের বেলকনি দিয়ে কালো হয়ে বের হয়ে বাতাসের সাথে মিসে যাবে। এই চাচাৎ বা ধোপ ধোঁয়া দেওয়ার কারণ হলো ফসল লাগানোর নির্দিষ্ট সময়ে যেন সমুদ্র থেকে কালো মেঘ উড়ে এসে সাংসারেক গারোদের জুম জমিতে প্রচুর বৃষ্টিপাত ঘটায়। চাচাৎ পোড়ানো শেষ হলেও ঘরের ভেতর ধোপের ধোঁয়া প্রচুর থাকে, সেই সময় নকমা নিজে ‘দানি’ এক ধরনের বাদ্যযন্ত্র বাজিয়ে ‘মিংআ চংআ’ বা মন্ত্র পড়ে বাজনার তালে তালে নাচে। মন্ত্রের কথাগুলোর লক্ষ্য উদ্দেশ্য একটাই জুম চাষ ফসল লাগানোর সময় যেন ঠিকমতো বৃষ্টি হয়, মাঠ-ঘাট ক্ষেত-খামার যেন পানিতে ভরিয়ে দেয়, সাংসারেক গারোরা যেন ফসল রোপন করতে পারে ইত্যাদি।
ধোপের ধোঁয়া কালো হয়ে ঘরের দরোজা জানালা, ঘরের চালের বেলকনি দিয়ে প্রচুর কালো ঘন হয়ে বের হলে সাংসারেক গারোরা খুশি হয়, মনে করে এরকম ধোঁয়ার মতো কালো হয়ে মেঘ আসবে, বৃষ্টি হবে। এ কারণে নকমা চাচাৎ বা ধোপ পুড়িয়ে ধোঁয়া দেওয়ার সময় সাবধানে, খুব সতর্কতার সাথে পুড়ে যেন প্রচুর ধোঁয়া হয়, সব সাংসারেক গারোরা দেখে যেন খুশি হয়। নকমা বা সর্দার তার নিজের বাড়িতে চাচাৎ বা ধোপ জ্বালানোর পর তার জামাই, যাকে নকমা নকক্রোং বা নকক্রোম হিসেবে এনেছে, সেও তার বাড়িতে আলাদাভাবে চাচাৎ বা ধোপ জ্বালাবে। লোকেরা নকমার ঘর থেকে বের হয়ে নকমার জামাইয়ের ঘরে ঢুকবে, জামাইয়ের চাচাৎ সওয়া বা ধোপ জ্বালানোর সাথে শামিল হবে, ঘরের ভেতর বাদ্য-বাজনা বাজাবে, নকমা শ্বশুরের মতো জামাইও মেঘ বৃষ্টির উদ্দেশ্যে ‘মিংআ চংআ’ বা মন্ত্র পাঠ করবে। এভাবে চাচাৎ সওয়া বা সুগন্ধি ধোপ পোড়ানোর পর সব লোকেরা ঘর থেকে বের হবে, নকমার উঠোনে একত্র হবে, বিভিন্ন জায়গায় যারা বসে থাকে তারাও আর বসে থাকবে না, সবাই একত্র হবে। যুবক-যুবতীরা পাশাপাশি লাইন লাইন সারি সারি দাঁড়াবে, বয়স্ক লোকেরাও বসে থাকবে না, একসাথে সারি সারি দাঁড়াবে, বাদ্য-বাজনা বাজাবে, বাজনার তালে তালে ছন্দ মিলিয়ে তাল ঠিক রেখে নাচবে। নকমার বাড়িতে গান গাওয়া, নাচা, শেষ হলে আবার সবাই মিলে অন্য বাড়িতে যাবে। একইভাবে বাজনার তালে তালে গান করবে, নাচবে, ক্লান্ত হলে বিশ্রাম নেবে। সেই সময় পরিবারের লোকেরা মদ পান করাবে, অন্যরকম নাস্তা দেবে। এভাবে গ্রামের প্রতিটা বাড়িতে ঘুরবে। অনেকে, যারা নতুন গান বা নতুন নাচ সৃষ্টি করেছে, তা সবার সামনে নেচে গেয়ে দেখাবে। সূর্য না ডোবা পর্যন্ত এ প্রোগ্রাম চলবে। প্রতিটা বাড়িতে এভাবে ঘুরে ঘুরে খাওয়াকে ‘ওয়াননা চাআ’ বা ‘ওয়াননা খাওয়া’ বলে।
কেউ যদি জিজ্ঞেস করে ও-বাড়িতে কি হচ্ছে, তখন বলবে, ‘ওয়াননা চা.এংআ’ বা ‘ওয়াননা খাচ্ছে’। এই ওয়াননা খাওয়া দিনে হয়, রাতেও হয়। তিন দিন পালন করলে, তিন দিন ওয়াননা চা.আও চলে। সূর্য ডোবার একটু আগে সবাই নিজ নিজ বাড়িতে চলে যায় সন্ধ্যা বা রাতের খাবার খাওয়ার জন্যে। কোনদিন নকমা বা অন্য বাড়িতে আগত লোকদের জন্যে পেট ভরে খাওয়া দেবে না এটাই সাংসারেক গারোদের নিয়ম। রাতে খাবারের পর কিছু বিশ্রাম নিয়ে আবার ওয়াননা চাআ বা ওয়াননা খাওয়া প্রোগ্রাম শুরু হবে। যে বাড়িতে হয়েছে, সে বাড়িতে আর হবে না। যে বাড়িতে হয় নি, তার বাড়িতে যাবে। কেউ যদি আবার অনুরোধ করে তবে অনুরোধ রক্ষা করবে।
এখানে শুধু গ্রামের যুবক-যুবতীরাই নয়, পাশের গ্রামের বা দূরের গ্রামের যুবক-যুবতীরাও অংশগ্রহণ করে, প্রতিযোগিতার মতো গান গায়, নাচে, নতুন কিছু সৃষ্টি হলে তা সবার জন্যে দেখাবে। ওয়াননা চাআ বা ওয়াননা খাওয়ার সময়ে বেশির ভাগ প্রতিযোগিতাই গান হয়, যেমন- রেরে গান, আজিয়া গান, দরওয়া গান, খাবি রিংআ গান, গসেরং গান, ও-হাইয়া গান আরো অনেক গান। এ সময়ে যুবক-যুবতীদের মিলন মেলার মতো হয়। তারা নিজেদের জন্যে যুবক-যুবতী বেছে নেয়, পরবর্তীতে বিয়ের জন্যে প্রস্তাব দেয়। অভিবাবকেরাও নিজেদের যুবক-যুবতী সন্তানের জন্যে বৌ জামাই দেখে। এখানে বা ওয়াননা অনুষ্ঠানে কারো উপর বা মেয়ে ছেলের উপর খারাপ আচরণ বা খারাপ কথাবার্তা দৃষ্টিকটূ আচার-আচরণ করতে পারে না, বয়স্ক পুরুষ মহিলারা এটাকে কঠোর নজরে রাখে। এরকম কোন খারাপ আচরণ পেলে বা দেখলে সঙ্গে সঙ্গে মান্যগণ্য লোকদেরকে নিয়ে শক্ত বিচার করবে, বেশিরকম হলে জরিমানা করা অথবা অনুষ্ঠান থেকে দোষী ব্যক্তিকে একেবারে তাড়িয়ে দেবে। ওয়াননা চাআ বা ওয়ানগালা অনুষ্ঠানের আগেই সবাইকে নকমা সতর্ক করে দেয়, বারবার স্মরণ করায়, যেন সুন্দর অনুষ্ঠানের মাঝখানে অহেতুক সমস্যা সৃষ্টি না হয়। সন্ধ্যার দিকে যখন নিজ নিজ বাড়িতে খেতে যায় তখন বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে নিয়ে যায়, খাওয়ার সময় নিজের খাবার অন্যজনের মুখে তুলে দেবে, আবার সেও তার খাবার সঙ্গির মুখে তুলে দেবে, এভাবে একে অপরের মাঝে ভাললাগা ভালবাসা প্রকাশ করবে। একটি গ্রামে একশত দেড়শত পরিবার থাকলে ওয়াননা চাআ বা ওয়াননা খাওয়া সহজে শেষ হতে চায় না। বড় গ্রামগুলোতে এক সপ্তাহ পর্যন্ত নাকি ওয়াননা চাআ থাকে।
লেখাটি শেয়ার করুন...
তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।
লেখাটি শেয়ার করুন...



0 Comments