প্রথম দিন : রোগালানি সাল
রোগালা ওয়ানগালা অনুষ্ঠানের প্রথম শুরু। গ্রামের লোকেরা খুব ভোরে শুকর ষাঁড় গরু মেরে, মাংশ তৈরি করে, প্রতিটা পরিবারের জন্যে পরিমাণ মতো দিয়ে দেবে। অন্য গ্রাম বা দূর-দূরান্ত থেকে যে গারোরা ওয়ানগালা দেখতে বা অংশগ্রহণ করতে আসবে তাদেরকে প্রতিটা পরিবারে এক-দুইজন করে ভাগ করে দেবে, নকমার বাড়িতে সংখ্যায় একটু বেশি থাকবে। গ্রামের সব লোক সকালে নিজ নিজ বাড়িতে মাংশ দিয়ে ভাত খেয়ে দুপুরের পর সবাই নকমার বাড়িতে আসবে, মান্যগণ্য লোক ও গ্রামের সবাই উপস্থিত হলে নকমা নিজের ঘরের মাঝখানে মিৎদে বা দেবতা সালজংয়ের জন্যে ধানের ছড়া বাঁধবে, যাকে সাংসারেক গারোরা ‘মিথংবল’ বলে। তারপর সাথে থামা থারিং বা বন আলু কুমড়া আদা শশা জাম্বুরা লেবু আরো অনেক ফল-ফলান্তি উঁচু করে একসাথে রাখবে। সাথে জমিতে বা জুম জমিতে ব্যবহার্য জিনিসপত্র যেমন দা কুড়াল কাঁচি চেনি কুদাল সব ব্যবহৃত জিনিসগুলো একসাথে রাখবে আর এক মুঠো চাউল নিয়ে তার ওপর ঢেলে দিতে দিতে প্রথমে রংকিমে মা’কে ডাকবে। রংকিমে মা হলো চাউলের মা, রংকিমে মা দয়া না করলে ধান গাছে ধানের ভেতর চাউল হবে না, শুধু সুসু হবে, কৃষক ধান পাবে না। তাই রংকিমে মাকে প্রথম স্মরণ করা। তারপর চু জাকরা বা প্রথম পানির মদ ধান সবজি দা কুড়ালের ওপর ঢালবে, এটাই রোগালা।
রোগালা মানে বাংলায় ঢালা। সহজ ভাষায় দেবতার জন্যে ভোগ দেওয়ার ওপর মদ ঢেলে দেওয়া। নকমা দু’টি কাঁকড়া ধরে এনে তার ওপর প্রথম পানির মদ ঢেলে দেয়, একটি কাঁকড়াকে পেট বরাবর ছোট লাটি দিয়ে ফুটো করে টাঙিয়ে রাখে, আরেকটি কাঁকড়াকে জীবিত ছেড়ে দেয়। নিজের বাড়িতে থাকা সমস্ত রাং- গারোদের করতাল একসাথে রাখে তার ওপর কলাপাতা দিয়ে মুড়িয়ে কলাপাতার ওপর চু জাকরা বা প্রথম পানির মদ পং বা পাত্রে ভরে ঢালতে থাকে। পরে নকমা নিজে চাউলের মাতা রংকিমে মাকে জোরে জোরে ডাকে, মন্ত্র পড়ে। এভাবে রোগালা বা ঢালার পর্ব শেষ করার সাথে সাথে লোকেরা রাং তুলে কাঠি দিয়ে বাজাতে থাকে। পরে উপস্থিত যুবক-যুবতীরা তৈরি করা চু বা মদ উপস্থিত সবার জন্যে পরিবেশন করে সন্ধ্যা না হওয়া পর্যন্ত নকমার উঠোনে মদ পান করবে, আনন্দ করবে। সন্ধ্যা হওয়ার সাথে সাথে রাতের খাবারের জন্যে নিজ নিজ বাড়িতে চলে যাবে। রাতের খাবার খেয়ে আবার নকমার বাড়িতে সবাই উপস্থিত হবে। রোগালার সন্ধ্যায় পাত্রে রাখা ‘ওয়ানথি পুরা’ বা চাউল গুড়া পানিতে গুলিয়ে হাতে মুখে কপালে ওয়ানগালার চিহ্ন হিসেবে মাখবে। আচিক গোত্ররা ‘ওয়ানথি পুরা’ বলে, আবেং গোত্ররা ‘মানথি পুরা’ বলে, বাংলা ভাষায় পিঠা তৈরি করার জন্যে চাউলকে গুড়া করা। অন্যান্য গোত্রে এ নামের আরো ভিন্ন নাম থাকতে পারে।
রোগালার রাতে
রাতে খাবারের পর নকমার বাড়িতে সবাই একত্র হয়। রাতে মিৎদে বা দেবতাকে আমুয়া ক্রিৎদা বা পুজো দেওয়ার কিছু নেই। কিন্তু যুবক-যুবতীরা ও কয়েকজন বয়স্করা থাকে। তারা সবাই একসাথে দামা দাদি সাৎদি বা ঢোল বাজিয়ে, রাং ক্রাম দকগি বা কুল করতাল বাজিয়ে, আদুরো বাংশি সিকগে অন্য ধরনের বাঁশি বাজিয়ে নাচবে গায়বে আনন্দ করবে। এক বাড়িতে এক দেড় ঘন্টা উঠোনে নেচে গেয়ে বাজনা বাজিয়ে আরেক বাড়িতে যাবে। এভাবে সারারাত আনন্দ করবে। যুবকেরা কিনারে কিনারে চারিদিকে ঘুরে বাদ্য বাজনা বাজাবে। আর সব যুবতী মেয়েরা মাঝখানে থেকে বাজনার তালে তালে নাচবে। বাজনার তালে তালে যুবক-যুবতীরা প্রতিযোগীতার মতো দুইজন করে আজিয়া গান করবে, শেষ হলে আরো দুইজন, এভাবে চলতেই থাকবে। সহজে শেষ হবে না। সেই পরিবারের লোকেরা যুবক-যুবতীদের জন্যে চু বা মদ বানিয়ে দেবে, তারপর একে অপরকে মদ খাওয়াবে, এটাকে সাংসারেক গারোরা ‘পান্থে মেথ্রারাং চু পেয়া’ বা প্রথম মদ নামায় বা ভাঙে বলে। মিয়াপা মিচিকমা বা বয়স্ক পুরুষ মহিলারাও চু বা মদ খায়, নাচে, দরওয়া গান করে, আজিয়া গান করে। গ্রামের নেতা বা নকমারাও, মান্য ব্যক্তিরাও সারারাত আনন্দ করে যুবক যুবতীদের উৎসাহ যোগায়। এ রাতে আনন্দ করা ছাড়া পালন করার মতো গুরুত্বপূর্ণ কোন কিছু নেই। অনেকে ছোট ছেলে মেয়েদের বাদ্য বাজনা শেখায়, রেরে আজিয়া গান শেখায়।
তর্পণ ঘাগ্রা : লেখক, গবেষক ও সমাজকর্মী।
লেখাটি শেয়ার করুন...



0 Comments