![]() |
| হেমার্সন হাদিমা |
গ্রামের নাম বলশালগ্রি হলেও এ গ্রামের ঘন অরণ্যে শুধুমাত্র বলশাল বা গজারি গাছ নয়, শত শত জানা-অজানা প্রজাতির বৃক্ষলতায় ভরা। এসব গাছপালার ফাঁক-ফোকরে অনেকখানি জায়গা সম্ভব মতো সাফ করে বাগান করেছে রামসিং। বাগানে আছে থাবলচু (কাসাভা), থা•মা থারিং (কচু), কিছু জায়গায় করেছে আদা হলুদ ইত্যাদি। খুব ভাল ফলন হয়। রামসিং-এর ধানি জমি নেই। এ জমি পাহাড়ের মতো ঢালুও নয়। এজন্য মি•মান্দি, মিসি মি অর্থাৎ চীনা কাউন বা পাহাড়ি ধানের ফসল করা যায় না। এ জন্য সে থাবলচু, থামা থারিং এবং আদা হলুদ আবাদ করেই সংসার চালায়। তা ছাড়াও, কাঁঠাল, পেয়ারা, লেবু, পেঁপে প্রচুর ফলে। কিছুটা দূরে আনারসের বাগানও করেছে। এসব দিয়েই তার দিন চলে।
রামসিং-এর বয়স হয়ে গেছে। বৃটিশের সময় সে নাকি আকাশে কী একটা জিনিস উড়ে যেতে দেখেছিল। আওয়াজটা খুব চিকন ছিল। তবে ওই বস্তুটা আসলে কেমন ছিল সে বলতে পারে না। সে তখন খুব ছোট ছিল। এ বয়সেও রামসিং বেশ শক্ত সামর্থ পুরুষ। তার তিন ছেলে পাশের গ্রামগুলোতে জামাই চলে গেছে। তিন ছেলের ঘরে অনেক নাতি নাতনি হয়েছে। ঘরে আছে এক মেয়ে। তার ঘরেও তিন সন্তান। বাড়ির কাজ-কাম ওই মেয়ে আর জামায়ই করে। রমাসিং-এর বড় কাজ হলো বাগান পাহাড়া দেওয়া। বনের শুকরগুলো থাবলচু আর কচুগুলো খেয়ে যায়। আর বানরগুলোও থাবলচু খেতে ওস্তাদ। ওরা পাল বেঁধে ক্ষেতে নামে। থাবলচু গাছে চড়ে দোল দিতে থাকে। গাছ উপড়ে গেলে আলুগুলো বেরিয়ে পড়ে। তখন সব বানর মাটি খুঁড়ে আলু তুলে খায়। বানর আর শুকর নামে পালে পালে। শুকরগুলো নামে রাতের বেলা। তবে বানরগুলো দিনের বেলায়ও সুযোগ পেলে দল বেঁধে অভিযান চালায়।
বনের এ শুকর আর বানরদের তাড়াবার জন্যে রামসিং তার বাগানের মাঝামাঝি থাকা বড় একটা বট গাছে বোরাং বানিয়েছে। বোরাং মানে গাছের উপরে বাঁধা টং ঘর। বোরাং বানাতে হলে গাছের ডালগুলো কেটে ছেঁটে সুবিধা মতো জায়গায় ঘর বানাতে হয়। কিন্তু রামসিং-এর বাগানের এ বট গাছটি এতটাই বড় যে, এর মূল কান্ড থেকে যেসব ডাল বেরিয়েছে, সেগুলো খুব মোটা এবং চ্যাপটা। চ্যাপটা বড় ডালে একজন মানুষ অনায়াসে ঘুমাতে পারে। এ জন্য রামসিং এ গাছের কোন ডাল না কেটে চ্যাপটা একটা ডালেই কাপড় বিছিয়ে ঘুমাবার ব্যবস্থা করেছে। শুধু তো রাতের ব্যাপার। দিনে তো সেখানে থাকতে হয় না। তাও আবার সারাবছর নয়, কেবল মৌসুমের সময়। রামসিং একাই এই অটো বোরাং এ রাত কাটায়। সাথে থাকে বিড়ি-ম্যাচ, একটা লাঠি, কেরোসিনের খালি টিন আর বাঁশের কঞ্চি দিয়ে বানানো কাঠি। রাতে বানর বা শুকর আসুক বা না আসুক মাঝে মাঝে টিনের বাড়ি দিয়ে জানান দেয় যে এ গাছেই রয়ে গেছে। পশুগুলো পালিয়ে যায়।
একরাতে রামসিং নিত্যকার মতোই তার বোরাং ঘরে ঘুমিয়ে আছে। সে রাতের মাঝামাঝি সময়ে অনেক মানুষের অস্পষ্ট কোলাহল শুনে জেগে ওঠে। ভাবে এত রাতে এ গহীন বনে এত লোক কোত্থেকে এল? সে শুনল, ওই লোকেরা কোথাও যাবার জন্য বোধহয় পরস্পরকে ডাকাডাকি করছে। রামসিং চোখ কান সজাগ করে চুপ করে থাকল। চোখ খুলে চারদিকে সতর্ক দৃষ্টি দিয়ে কিছু একটা দেখতে চেষ্টা করল, কিন্তু কাউকেই দেখল না। এমনিতে ঘন বন, তার আবার অমাবশ্যার রাত। মনে হলো, তার শুয়ে থাকা গাছটির কাছাকাছি আরেকটা গাছ থেকে কে যেন বলল, ‘মামা! তুমি যাবে না?’
রামসিং সজাগ হয়ে সতর্ক দৃষ্টি দিয়েও কাউকে দেখতে পেল না। সে যে গাছটায় শুয়ে আছে, সেই গাছটা বোধহয় একটু নড়ে ওঠল। মনে হলো এ গাছটাও বলল, ‘নারে ভাগিনা, আমি আজ যেতে পারছি না। আমার ঘরে একজন অতিথি আছে। তাকে একলা ফেলে আমি যেতে পারি না। তোমরা যাও। এবং কী করে এলে, ফিরে এসে আমাকে বলবে কিন্তু।’
তারপর শোনা গেল, অনেক লোক অস্পষ্টভাবে কী-সব যেন বলাবলি করতে করতে কোথাও বোধহয় চলে গেল। জঙ্গলটা আবার সুনসান নীরব হয়ে গেল। রামসিং ভাবে সে যে গাছটায় রয়ে গেছে অন্যসব গাছ চলে গেলেও এ গাছটি যায় নি। বলেছে যে, তার ঘরে অতিথি থাকায় সে যেতে পারে নি। তাহলে, এ বট গাছটা তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছে?
এরচেয়ে অবাক করা ব্যাপার হলো, ভোর রাতের দিকে আবার জঙ্গলে আগের মতোই অনেক লোকের শোরগোল শোনা গেল। তার শুয়ে থাকা গাছটা একটুখানি নড়ে ওঠলে সে কান পেতে শুনতে পেল, এ গাছটা বলছে, ‘কিরে ভাগিনা, কী করে এলি?’
পাশের গাছটা থেকে কেউ বলল, ‘মামা! জামরির একটা ছেলে সন্তান হয়েছে। ছেলেটা খুব সুন্দর। সবাই মিলে ঠিক করে এলাম, ছেলের আয়ু হবে তিন বছর। সে তাদের পুকুরে ডুবে মারা যাবে।
রামসিং-এর গাছটা বলল, ‘কেন? এরকম খারাপ ভাগ্য বরাদ্দ করে এলে কেন?’ পাশের গাছটা বলল, ‘মামা! জামরির স্বামী চিজেংটা বড় অহংকারী। সে মিৎদি মান্দি কাউকেই মানে না। সে নাকি কেলাস টু পড়েছে। এজন্য বলে, কোন বইয়ে মিৎদি মান্দিকে মানতে হয় বলে লেখা নেই। এ জন্য আমরা ঠিক করে এলাম তিন বছরে তার এত সুন্দর ছেলেটা যখন মরে যাবে ঠিক সে সময়েই দো.মিশাল (বন মোরগ) লম্বা করে কয়েকবার ডেকে ওঠল। বনটা আবার নীরব হয়ে গেল। কিছুক্ষণ পরেই পুবের আকাশ ফর্সা হয়ে ওঠল।
ভোর হয়ে গেলে রামসিং তার বোরং থেকে নেমে বাড়ি গেল। তার বিশ্বাস এ বট গাছটা তাকে রক্ষা করার দায়িত্ব নিয়েছিল। তাই গাছ থেকে নেমেই গাছের গুঁড়িতে মাথা ঠেকিয়ে বলল, ‘আপফা! আমার বাগানে শুকর আর বানরের অত্যাচার দেখে তোমার গায়ে ঘুমাই। আমি থাকলে তোমার অসুবিধা হয়, কোথাও যেতে পার না। আমি আর আসব না। তুমি আমার বাগানটা রক্ষা করো।
সেদিন থেকে রামসিং রাতে আর বাগান পাহাড়া দিতে যায় না। তবু এরপর কোন শুকর বা বানর তার বাগানের থাবলচু কচু খেতে আসে না। সে কৌতূহল বশেই তাদের পাশের গ্রামে থাকা চিজেং-এর বাড়ি চলে গেল। দেখল, জামরির কোলের ছোট্ট শিশুটা খুবই সুন্দর। রামসিং-এর আপন ভাগ্নি জামরি। এত সুন্দর ভাগ্নি পুত্রকে দেখে রামসিং-এর বড় মায়া হলো। এই সুন্দর শিশুটার পরমায়ু মাত্র তিন বছর, সে কথা মনে পড়তে তার চোখে জল এল। জামরি তাকে বলে, ‘মামা! আমার ছেলে হয়েছে, আমি খুব খুশি। আর তুমি দেখছি কাঁদছো!’
রামসিং বলল, ‘আনি, তোমার ছেলে খুব সুন্দর হয়েছে, আমারও খুব ভাল লাগছে। কিন্তু এ ছেলে তিন বছর বয়সেই পুকুরে ডুবে মারা যাবে। তাই খুব কষ্ট লাগছে।’
একথা শুনে চিজেং বলে, ‘মসা কি পণ্ডিত হয়ে গেলে নাকি! কোন মিৎদি তোমাকে বলল যে, তিন বছরে আমার ছেলে জলে ডুবে মারা যাবে? আমি তোমাদের কোন মিৎদিকে জানি না, আর তোমার মতো কোন মান্দিকেও বিশ্বাস করি না।’
রামসিং খুব সহজ ভাবেই বলে, ‘মসা, মিৎদি বা মান্দি সবাইকেই বিশ্বাস করতে হয়, মান্য করতে হয়। মিৎদি বা মান্দি কাউকে না মেনে কত কিছুই তো করে চলেছ। কিন্তু কোন কাজেই তো সফল হচ্ছো না। আমি এত করে মানা করলাম, তবু না শুনে বাঙালদের বিরুদ্ধে মামলা করছো! সব মামলাতেই তো হেরে যাচ্ছো। কোন একটা বড় আদালতে নাকি তুমি জিতে গেছ। কিন্তু তোমার ওই আদালতের রায় দিয়ে তো কিছুই করতে পারছ না। বাঙালগুলান তো জমি ছাড়ছে না। এর পরেও আরো অনেক মামলার হাজিরা দিয়ে দিয়ে ফতুর হয়ে যাচ্ছো। অনেক টাকা ঋণ করেছ। বলছ, আদালতে ডিক্রি আছে দখলটা পেলেই তুমি ঋণ শোধাবে। কিন্তু বছর মামলার খরচ যোগাতে যে টাকা ঋণ করছো একদিন দেখবে সব জমি বিক্রি করেও তোমার ঋণ শোধ হবে না। আমার ভাগ্নি নাতি নাতনিরা জলে ভাসবে। এখনও সময় আছে, ভেবে-চিন্তে কথা বলো এবং দেখেশুনে কাজ করো।’
বাস্তবত চিজেং রামসিং-এর কথা শুনে নি। তার কোন পরিবর্তন হয় নি। তিন বছর পর তার ওই সুন্দর ছেলেটা পুকুর পাড়ে খেলতে খেলতে তার খেল না বলটা জলে পড়ে গেলে সে ওই বলটা আনতে পুকুরে নামল। কিন্তু সে তো সাঁতার জানত না। জলে ডুবে মরল। এরই মধ্যে চিজেং তার সব মামলায় হেরে গেল। যারা তাকে মামলার জন্য টাকা ধার দিয়েছিল, তারা সুদে আসলে টাকা দাবী করতে লাগল। বাধ্য হয়ে যেটুকু জায়গা জমি ছিল সব বিক্রি করে দেনা শোধ করল। এর পরেও অনেক টাকা দেনা থাকল। পাওনাদারদের ত্যক্ত সইতে না পেরে চিজেং ঘর ছেড়ে পালিয়ে গেল। কোথায় গেল কেউ জানল না। শোনা যায়, সে সীমা পেরিয়ে ভারতের মেঘালয় রাজ্যের রংরাম নামক পাহাড়ি গ্রামে কোন এক গৃহস্থ ঘরে মুজুরি খেটে খায়।
রামজিং-এর কথা, মিৎদিরা মানুষের সৌভাগ্য নির্ধারণ করে ওই মানুষদেরই জন্যে যারা মিৎদিদের মান্য করে এবং মান্দিদের বিশ্বাস করে। কিন্তু যারা মিৎদি মান্দি কাউকেই মানে না, বিশ্বাস করে না, তাদের জন্য নির্ধারণ করে দুর্ভাগ্য।
হেমার্সন হাদিমা : লেখক।


0 Comments