![]() |
| পরাগ রিছিল |
“নিজেদের সংস্কৃতির জিনিসও যদি অন্যদের কাছেই কিনতে হয়, যা নিজেরা নিজেরাই কেনাবেচা করতে পারতাম, তাও আর নিজেদের হাতে থাকল না! তাহলে আর থাকল কি?”
এবার গারোদের ব্যস্ততম মৌসুম।
অনেক
বিয়ে-শাদি, বড়দিন, ছোটদিন। পেটপুরে খেয়ে
মানুষ
যেমন
আয়েশে
পত্রিকা পড়তে
বসে,
এটাই
বুঝি
সে-ই সময়। এ
সময়টায়
লেখকদেরও কিছু
ব্যস্ততা থাকে,
লেখার
অর্ডারি থাকে।
শরৎবাবু যদিওবা
বলেছিলেন, অর্ডার
দিয়ে
সৃষ্টিশীল লেখা
পাওয়া
সম্ভব
নয়।
লেখার
যে
বিন্দুমাত্র হলেও
গুরুত্ব রয়েছে
সমাজে
এ
মৌসুমেই হয়ত
তাও
উপলব্ধি করা
যায়।
রাংরাপাড়ার যুবক-যুবতীরা বছর
পাঁচেক
আগে
একটা
নতুন
শব্দ
উদ্ভাবন করেছিলেন, ‘পনেন’। পনেন শব্দের
অর্থ
হচ্ছে
যাদেরকে সব
বিয়েতেই দেখা
যায়
বা
বিভিন্ন অনুষ্ঠানে যাদের
মুখ
চোখে
পড়ে
বেশি।
একটু
তুচ্চার্থে বা
ব্যঙ্গভাবে এ-শব্দের সৃষ্টি হলেও
অনেক
বছর
পর
এবার
‘পনেন’
হবার
চেষ্টা
করেছিলাম! এ
বছর
নতুন
পনেন
শব্দটি
নতুন
অর্থ,
তাৎপর্য নিয়ে
আমার
সামনে
হাজির
হয়েছিল
যে,
পনেন-রা সামাজিক। সবার
সাথে
সামাজিকতা রক্ষা
করে
চলতে
চায়।
তো,
চেষ্টাসত্ত্বেও একদিনে
তিনটার
বেশি
অনুষ্ঠানে হাজির
হতে
পারি
নি।
তাও
এক
গ্রামের এপাড়া-ওপাড়ায় দুইটা অনুষ্ঠান ছিল
বলে
আর
অন্য
গ্রামে
আরেকটা
অনুষ্ঠান। বিনিময়ে সামাজিকতা রক্ষা
করতে
গিয়ে
মামার
শ্রাদ্ধ বাদ
দিতে
হয়েছে।
প্রায়
এক
বছর
আগে
যে
মানীর
শ্রাদ্ধতে কামারখালি যাব
বলে
ঠিক
করে
রেখেছিলাম, সেখানে
আর
যাওয়াই
হলো
না!
আমরা সবাই ভাবতে
শুরু
করেছি,
ছুটি
তো
নাই,
নিজেদের কাজটা
এর
মধ্যেই
সেরে
ফেলি।
এভাবে
কি
আমরা
বিচ্ছিন্নতার চর্চাও
শুরু
করেছি?
এখন
গ্রামে
থাকি
তাই
শহরের
মানুষের সরগরম
আনাগোনার কিছুদিন পর
গ্রামগুলি কেমন
সুনসান
হয়ে
পড়ে
তাও
প্রত্যক্ষ করলাম।
সীমান্তবর্তী এক উপজেলায় এক
মাসির
সাথে
কথা
হচ্ছিল। তিনি
‘সেলাই
দিদিমণি’র
কাজ
করবার
পাশাপাশি নিজেদের ঐতিহ্যের পোশাক
দকমান্দা কিছু
তুলে
খুচরোভাবে বিক্রি
করতেন।
জানালেন এক
দুঃখের
কথা।
নিজেদের মানুষেরা বড়
বড়
ব্যবসায়ীদের কাছে
সেসব
দকমান্দার চালান
তুলে
দেবার
পর
এমন
ছোট
ছোট
দোকানে
কেউ
আর
দকমান্দার খোঁজ
নেন
না।
বেশি
সংগ্রহ
থাকায়
সবাই
তাদের
কাছেই
যায়।
বড়
শহরগুলো থেকে
যারা
নিতে
আসে
তারাও
তাদের
কাছেই
যায়।
তাদের
ছোট
ব্যবসা
একেবারে মন্দায়
উঠে
গেছে!
বলা
বাহুল্য সেসব
বড়
ব্যবসায়ীরা মারোয়ারী গোত্রীয়, নিজেদের কেউ
নন।
তিনি
দুঃখ
করে
বলছিলেন, নিজেদের সংস্কৃতির জিনিসও
যদি
অন্যদের কাছেই
কিনতে
হয়,
যা
নিজেরা
নিজেরাই কেনাবেচা করতে
পারতাম,
তাও
আর
নিজেদের হাতে
থাকল
না!
তাহলে
আর
থাকল
কি?
আর
গ্রামে-গঞ্জে ঘুরতে ঘুরতে
অনেক
জায়গায়
দেখেছি,
আদিবাসী তাঁত-দকসারি বানাচ্ছেন, উঁকিঝুকি দিয়ে
তাদের
মধ্যে
আদিবাসী কাউকে
দেখতে
পাই
নি।
ফেসবুকে এ মৌসুমের পর
কারো
কারো
প্রতিক্রিয়া অনুভূতি দেখতে
পাচ্ছি,
যাঁদের
ভাবনা
সত্যিকারেই সমাজের
জন্য
উপকারী। তাঁদের
মধ্যে
সুমনা
চিসিম,
ডোনাল্ড হাউই,
সম্রাট
ডি.
সাংমা,
মুন
নকরেক
সিলক্রিং-য়ের
অনুভূতিগুলো হৃদয়
ছুঁয়ে
গেছে।
তাঁরা
প্রত্যেকে নিজেদের মতামত
ব্যক্ত
করেছেন
নিজেদের সংস্কৃতি ফেলে
রেখে
বেপরোয়াভাবে অপরের
সংস্কৃতি ধার
করে
চর্চার
জন্য।
অনেকের
কাছ
থেকেই
এমন
প্রতিক্রিয়া পাওয়ায়
সত্যি
হতাশ
বোধ
করছি।
যেন
সমাজে
নেমে
আসতে
চাইছে
সাংস্কৃতিক দৈন্যতা, মানসিক
দৈন্যতা...
“স্নেহের
ছোটভাই নিপুণ
দ্রং- মূর্ছনা
মানখিনের বিয়েতে।
ফুল তোলা
শাদা দকমান্দা
পরে বিয়ের
স্টেজে দাঁড়ালেন
মূর্ছনা মানখিন।
তাতে কোনোকিছু
ম্লান হয়েছে
বলে তো মনে হয় নি! বরং মনে হলো উজ্জ্বলতর হয়েছে...। এ বিষয়টার প্রশংসা
করতে সঙ্গী
হয়ে আসা ধোপাঝুরি-আসকিপাড়ার তরুণীরা
গর্বের সাথে
বলে উঠলেন,
‘আমাদের গ্রামে-এলাকায় আইসেন, এরকম
আরো অনেক
বিয়ে দেখতে
পাবেন।’ - এমন গর্বগুলিই তো প্রকৃত
গর্ব হওয়া
উচিত।”
যাদের লেখা সামনে
পড়েছে
তাঁদের
কথা
বললাম
এর
বাইরেরও নিশ্চয়ই এসব
ব্যাপারে উদ্বিগ্ন হওয়া
আরো
অনেক
মানুষ
আছেন।
সমস্যাগুলো পুরাতনই কিন্তু
বাড়ার
হার
মাত্রাতিরিক্ত হয়ে
যাচ্ছে। এ
যেমন
হিন্দি
গান
বা
উচ্চ
বিটের
কোন
গান
ছাড়া
কোন
অনুষ্ঠানই যেন
আর
চলতে
চাচ্ছে
না!
গায়ে
হলুদ
ছাড়া
বিয়ে,
ভাবাই
যাচ্ছে
না!
পাশ্চাত্য পোশাক
ছাড়া
বিয়ে,
ভাবাই
যাচ্ছে
না!
করবেনটা কী?
আমার
আপনার
বাড়িতেই তো
হচ্ছে,
নাকি?
কিছু উজ্জ্বল ব্যতিক্রমও অবশ্য
লক্ষ্য
করলাম।
স্নেহের ছোটভাই
নিপুণ
দ্রং-
মূর্ছনা মানখিনের বিয়েতে। ফুল
তোলা
শাদা
দকমান্দা পরে
বিয়ের
স্টেজে
দাঁড়ালেন মূর্ছনা মানখিন। তাতে
কোনোকিছু ম্লান
হয়েছে
বলে
তো
মনে
হয়
নি!
বরং
মনে
হলো
উজ্জ্বলতর হয়েছে...। এ বিষয়টার প্রশংসা করতে
সঙ্গী
হয়ে
আসা
ধোপাঝুরি-আসকিপাড়ার তরুণীরা গর্বের
সাথে
বলে
উঠলেন,
‘আমাদের
গ্রামে-এলাকায় আইসেন, এরকম
আরো
অনেক
বিয়ে
দেখতে
পাবেন।’
- এমন
গর্বগুলিই তো
প্রকৃত
গর্ব
হওয়া
উচিত।
আরেকটা ব্যতিক্রম এবার
লক্ষ্য
করেছি
মনিকুড়ার দ্রং
দপফায়।
সেটা
অবশ্য
সংস্কৃতির কোন
বিষয়
না,
খাবার-দাবারের ক্ষেত্রে বড় সা.মদিকে
জলপাইয়ের চাটনি/
ঝোল
রেঁধে
সবার
পাতে
পরিবেশন করা
হচ্ছে।
ওয়াক
খেতে
খেতে
ক্লান্ত হয়ে
যাওয়া
মানুষের জন্যে
তা
যেন
এক
নতুন
টোটকা।
বাচ্চা
ছেলেমেয়েরা চেয়ে
নিয়ে
খাচ্ছে
তো
খাচ্ছেই! বড়রাও
খেতে
খেতে
অনেকে
মুখ
টক
টক
করে
ফেললেন। ব্যতিক্রম বলে
এ
ঘটনাটার উল্লেখ
করলাম।
মাতৃভাষা চর্চা নিয়ে অগ্রজদের কাছে
উদ্বিগ্ন হতে
শুনে
এসেছি
বিশেষ
করে
ইন্টারমিডিয়েট প্রথম
বর্ষে
ভর্তি
হবার
পর
থেকে।
কই
তারপরও
তো
বিশেষ
কোন
বড়
পরিবর্তন পরিলক্ষিত হলো
না?
সেই
আমারই
পড়াশোনা শেষ
হয়ে
প্রায়
একযুগ
পেরুলো। একবার
অবশ্য
সমাজে
বড়
একটা
ধাক্কা
লেগেছিল। সন্তানদের গারো
নাম
রাখার
হিড়িক।
একটা
ভাল
টার্ন।
ক্রমান্বয়ে পরে
সেটাও
স্থিমিত হয়েছে।
মাতৃভাষা রেখে নিজেদের মধ্যে
বাংলা
চর্চার
হার
বেড়েছে
কয়েকগুণ। হয়ত
তিনগুণ,
চারগুণ
বা
তারও
বেশি!
সারাদিন কর্মস্থলে বাংলা
বলেন,
বাঙালি
বন্ধু-বান্ধবদের সাথে প্রায় সারাদিনই বাংলা
বলেন
বিদ্যায়তনে। রাস্তায় দেখা
হলে
তাই,
‘নাম্মি
দংঙা
মা’
এ
ছোট্ট
বাক্য
বলতেও
হয়ত
কষ্ট
হয়ে
যায়!
ক্লান্ত হয়ে
পড়েন;
বাসায়
বাবা-মায়ের সাথে গারো
ভাষা
বলতে
আর
কোন
শক্তি-ই থাকে না!
সেই
আপনিই
আবার
গারো
বলে
গর্ববোধ করেন।
মাতৃভাষা বলেন
না,
দকমান্দা পরেন
না
এসব
বলতে
গেলে
তো
আবার
আমারে
গালি
দেওয়া
শুরু
করবেন...।
পরাগ রিছিল: কবি, গবেষক।


0 Comments