![]() |
| রুমি চিরান |
একসময়
‘নাংরিমা গারো খ্রিস্টিয়ান চার্চ’ থেকে ‘আচিক পত্রিকা’ নামে একটি পত্রিকা বের হতো। ওই পত্রিকায় শুভজিৎ
দা’র ‘চলো জামাই
যায়’ ধারাবাহিক লেখাটি আমার মাঝে, পাঠক সমাজে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। যদিওবা ওই সময়টাতে আমি
আমার অপরিপক্ক বয়সের কারণবশত লেখাটির মর্মার্থ পুরোপুরি বুঝে উঠতে পারি নি। আজ এ বিষয়টি
নিয়েই কিছু লেখার ইচ্ছে প্রবল হচ্ছে এবং লিখছিও।
এটা
বলার দরকার নেই যে আমরা গারো।
আমাদের পরিবার, সমাজ, তথা সবকিছুই নির্দিষ্ট একটা নিয়ম-কানুন বা রীতি-নীতি
দ্বারা পরিচালিত। যেমন—আমাদের সমাজব্যবস্থা মাতৃতান্ত্রিক, যে কারণে একটি
পরিবারে মায়েরাই প্রধান বলে গণ্য হয়। মায়ের বংশ পরিচয়েই সন্তানেরা পরিচিতি লাভ করে। একই গোত্রের নারী-পুরুষের মধ্যে বিবাহ নিষিদ্ধ। যদি কোন কারণে বিবাহ হয়েও থাকে সে বিবাহ অবৈধ্য
(মাদং) বলে আখ্যায়িত হবে। কন্যা সন্তানেরাই অধিকাংশ সম্পত্তির উত্তরাধিকার লাভ করে।
পুরোনো
রীতি অনুযায়ী যে বিষয়টি জানা
যায়- তা হলো, আগেকার
দিনে প্রত্যেক পুরুষকেই চাওয়ারি (জামাই) যাওয়ার প্রথাকেই সমর্থন করতে হতো। কোন ছেলেকে কোন মেয়ের জন্য চাওয়ারি হিসেবে পছন্দ হলে সমাজের সকলে মিলে ছেলেটাকে জোর করে ধরে এনে দ.দকগা করে
বিয়ে দিত। এক্ষেত্রে ছেলে কিংবা মেয়ে তাদের নিজেদের পছন্দ-অপছন্দকে প্রাধান্য দেওয়ার সুযোগ পেত কম। বাবা-মা সর্বোপরি সমাজের
সিদ্ধান্তকেই চূড়ান্তভাবে মেনে নিতে হতো।
সময়ের
বিবর্তনের সাথে বিবাহরীতি, নীতি, সমাজব্যবস্থা, তথা অনেককিছুই পাল্টে যাচ্ছে। বর্তমান সমাজব্যবস্থায় চাওয়ারি বা নামচিক নিয়ে
আসার পক্ষে-বিপক্ষে সমাজে অনেক গুরুত্ব¡পূর্ণ মতামতও বেরিয়ে আসবে। এ বিষয়ে অনেক
যুক্তিতর্ক উত্থাপিত হওয়াটাই স্বাভাবিক। আরএটাও স্বাভাবিক যে, আমরা কোনকিছু পাওয়ার বিষয়টাকেই বেশি প্রাধান্য দিতে সাচ্ছ্বন্দবোধ করি। কে কি হারালো,
বা, হারানোর বেদনাটা কতটুকু বাস্তব, তা অনুভব করার
চেষ্টা করি না। লেখক হিসেবে আমি আমার নিজস্ব দৃষ্টিকোণ ও চিন্তাধারার আলোকে
উঠে আসা বিষয়গুলোকেই এ লেখাটিতে তুলে
ধরার চেষ্টা করব।
চাওয়ারি
নিয়ে আসাটা যেহেতু আামাদের আম্বি-আৎচুর যুগ থেকে প্রচলিত আছে সেহেতু চাওয়ারি নিয়ে আসাটাই আমি উচিত বলে মনে করি।নতুন পরিবারে এসে আপনি বউ, শ্বশুর-শাশুড়ি, ননদ, দেবর সবাইকেই কাছে পাওয়ার সুযোগ পাচ্ছেন। এদিক বিবেচনা করলে হয়তবা আপনার মনে একটা ভয়ের কারণও উদয় হতে পারে, আমি কি আমার শ্বশুর
পরিবারের সবার সাথে খাপ-খাইয়ে চলতে পারব?এটা কোন ব্যাপার নয়, আপনি তো কাজের সূত্রে
সারাদিন ঘরের বাইরে অর্থাৎ অফিস-আদালতে বেশি সময় কাটাবেন, সুতরাং নামচিক পরিবারের কোন ইতিবাচক বা নেতিবাচক প্রভাব
আপনার ওপর পড়বে খুবই সীমিত পরিমাণে।
এবার
আসুন আপনার তিলতিল করে গড়ে তোলা ধন-সম্পদ নিয়ে।
আপনি হয়ত ভাবছেন, আমার বউ মারা গেলে
যদি চাপ্পা করার মতো কেউ না-থাকে তাহলে
তারা আমাকে তাড়িয়ে দেবে, না-হয় আমার
মানক বাড়ির লোকেরা এসে টেনে নিয়ে যাবে। এ পরিস্থিতিতে এত
কষ্টে গড়া সম্পদ কি হাতছাড়া হয়ে
যাবে?না, আপনার সন্তানরা তো আছেই! আর
ধন-সম্পদ নিয়ে এত মাথা-ব্যাথার
কারণটাই বা কী! আমরা
তো কেউই এর প্রকৃত মালিক
নই। মালিক শুধু একজনই আছেন।
আপনি
হয়ত খুব করে হেসে হেসে টুকটুকে সুন্দরী নামচিক নিয়ে আসলেন। এক মায়ের বুক
খালি করে আরেক ভাবী মাকে। যে-কিনা একসময়
এমনই একজন মা হবে। সংসার
জীবনে প্রবেশের পর সন্তান লালন-পালনের দায়িত্ব কাঁধে পড়লে অধিকাংশ নামচিক ঘরের বাইরে অর্থাৎ অফিসিয়াল কাজে যোগ দিতে পারে না, যে-কারণে তাকে
সারাটা দিন পরিবারের সাথেই কাটাতে হয়। এ প্রেক্ষিতে ওই
নামচিকের ওপর তার শ্বশুর পরিবারের ভাল বা মন্দ দিকগুলো
কতটুকু বর্তাবে ভেবে দেখুন? তবে হ্যাঁ, দিকটা পজেটিভ হলে সাব্বাস।
এবার
আপনার মেয়ের কথাই আসি। ধরেন, আপনার ঘরে বিয়ে উপযুক্তএকজন যুবতী মেয়ে আছে। ক’দিন পরেই
তাকে বিয়ে দিতে যাচ্ছেন। এখন চাওয়ারি পক্ষের পরিবার এসে যদি বলে, আপনার একমাত্র আদরের কন্যাকে আমরা নামচিক হিসেবে নিয়ে যেতে চাই। তা না-হলে
এ বিয়ে বন্ধ। এমূহুর্তে আপনি কি জবাব দেবেন?
আপনিও
তো একসময় ঠিক একইভাবে নামচিক নিয়ে এসেছিলেন। এবার নিজের কলিজার টুকরোকে নিজের হাতে পরের ঘরে তুলে দেবেন, এছাড়া আর কী! তারপর
সে মূহুর্ত থেকে শুরু করে চুলপাকা পর্যন্ত বসে বসে ভাবতে থাকবেন, আহ! মেয়েটা কাছে থাকলে এ-বয়সে অন্তত
বাবা-মায়ের সেবা করত, এ-বিষয়ে আপনি
আপনার মেয়ের কাছ থেকে যতটা আশা করছেন, নিশ্চয় সেটুকু ছেলের বউয়ের কাছ থেকে করবেন না! তবে হ্যাঁ, ভাগ্যক্রমে ছেলেবউযদি লক্ষ্যি হয় তবে বাঁচা
গেল, বাস্তবে এমন পাওয়াটা বিরল।
এ পর্যায়ে লিখছি আপনার বোনের কথা। আপনি হয়ত ভাবছেন, আমার বোন বা মেয়েকে আমি
কখনই পরের ঘরে নামচিক যেতে দেবনা। ঘরের মেয়ে ঘরেই থাকুক। সবসময় পরিবারের সবার সাথে সময় কাটাক। এ যদি হয়
আপনার একান্ত ভাবনা, তাহলে কেন আপনি আরেক জনের বোনকে নামচিক নিয়ে আসার পরিকল্পনা করছেন?
আপনার
বোনের মতো সেও তো তার পরিবারকে
সঙ্গ দিতে পারে। বরং আপনি চাওয়ারি চলে যান। এছাড়াও যে বিষয়গুলোকে লেখাটিতে
উল্লেখ না করলেই নয়,
যে পরিবার থেকে আপনার জীবনের সূচনা হয়েছে সেই পরিবারের সদস্যদের সাথে আপনি আপনার সুখ-দুঃখের কথাগুলো যতটা সহজে প্রকাশ করতে পারবেন, অন্য কোন পরিবারের লোকেদের কাছে সেভাবে সুখ-দুঃখের কথা বা মত প্রকাশ
করতেপারবেন না।
নিজ
পরিবারের কাছ থেকে পাওয়া কোন বিরূপ আচরণ আপনি ক্ষণিকের মধ্যেই ভুলে যেতে পারবেন। আবার আপনার কাছ থেকে ঠিক এমনটা ব্যবহার পেলে আপনার পরিবারে সদস্যরাও দীর্ঘদিন মনে গেঁথে রাখার চেষ্টা করবে না, কিন্তু, অন্য কোন পরিবার থেকে এমন পরিস্থিতির স্বীকার হলে সেই ক্ষত বা ক্ষতি কি
এত সহজে মুছে যাবে বলে মনে হয়? হয়তবা না, আমি যা দেখি তা
অর্ন্তদৃষ্টি থেকেই দেখি, যা লিখিতা সহজ
ভাষাতেই লিখি। যাতে করে সাধারণ মানুষও এর অর্থ বুঝতে
পারে। মাঝে মাঝে আলাপচারিতার ফাঁকে কৌশলে আমি অনেক চাওয়ারির কাছ থেকে তথ্য সংগ্রহের চেষ্টা করি, যখন আমি তাকে প্রশ্ন করি, আপনি নামচিক নিয়ে আসলেন না? চাওয়ারি গেলেন কেন?এর উত্তরে কেউ
কেউ বলেন, ধুৎ!নামচিক এনে কি করব, ক’দিন পরে মায়ের বাড়িতেই চলে যায়, এর চেয়ে বরং
আগেভাগে চাওয়ারি যাওয়াই ভাল।
কেউ
আবার বলে, হ্যাঁ, নামচিকই তো নিয়ে এসেছিলাম,
ঘুরে-ফিরে চাওয়ারি হিসেবেই থাকতে হচ্ছে নামচিক বাড়িতেই।
পুরো
লেখাটা পড়ে আপনারা হয়ত মনে মনে ভাবছেন, লেখক মশাই চাওয়ারি পক্ষ সমর্থন করছেন। যদি তাই ভাবেন, তাহলে মনে করবেন আত্মীয় আমার এবং অধিকাংশ মেয়েদের মনের কথাই বলে দিলেন। আপনারা যদি মাতৃতন্ত্রকে মেনে নিতে পারেন, মায়ের বংশ পরিচয়ে নিজেদের পরিচয় দিতে প্রস্তুত থাকেন, তাহলে চাওয়ারি আসতে এত দ্বিধা করেন
কেন? এটাও তো গারোদের একটা
পুরোনো রীতি। শেষাংশে এসে আমি বলতে চায়, চাওয়ারি বা নামচিক যেটাই
আপনি বেছে নেন না কেন, স্বামী-স্ত্রী হিসেবে আপনারা একজন আরেকজনের ব্যক্তি স্বাধীনতার ওপর হস্তক্ষেপ করা থেকে বিরত থাকবেন। দু’জনই একে-অপরের পছন্দ-অপছন্দকে জানার ও বোঝার চেষ্টা
করবেন। কারণ প্রত্যেক মানুষের মাঝেই ব্যক্তি স্বাতন্ত্র বলে একটা বিষয় আছে। যে-কারণে একজন
ব্যক্তি অন্যজন থেকে আলাদা হয়। সুতরাং সবকিছুই আপনার মনের মতো হতে হবে তা ঠিক নয়,
মনে রাখবেন চাওয়ারি নামচিক হিসেবে আপনারা যে দুই পরিবার
থেকে এসেছেন সেই দু’টো পরিবারকেই
সমান পাল্লায় মাপার চেষ্টা করবেন। একটা পাল্লা ভরাতে থাকবেন আর অপর পাল্লাটা
শূন্য রাখবেন এমনটা যেন না হয়। এসব
ছোট ছোট বিষয়গুলোকে এড়িয়ে চললেই আপনাদের সোনার সংসারে অশান্তির কারণ সৃষ্টি হতে পারে।


0 Comments