গাবুল বা গাবিল মাচং চাৎচি বা উপাধির লোকেরা সবাই গাবিল মাচং চাৎচি বা উপাধি নিয়ে থাকে নি অনেক গাবিল মেয়েরা পুনরায় ঘাগ্রা উপাধি নিয়ে নেয়। এভাবে ঘাগ্রা থেকে গাবুল, পরে গাবিল মাচং চাৎচি বা উপাধি সৃষ্টি হয়। কতো কথা, কতো কাহিনী গারো বৃদ্ধ-বৃদ্ধারা বলে—বংশ পরম্পরায় সেসব শুনে, স্মরণ রেখে, আজও কোন সমস্যা ছাড়াই বলে যেতে পারে। কোন কাগজে লিখে রাখে নি, কোন দলিল নেই, শুধু মুখে মুখে ধরে রেখেছে, শেষ হতে দেয় নি। সবকিছু ধরে রাখতে পেরেছে এমন নয়, বেশির ভাগ কাহিনী ঘটনা হারিয়ে ফেলেছে। মনে হয় ঘাগ্রা, গারা, গারে, গারাই, কাকড়া মাচং চাৎচি বা উপাধিরও এরকম কাহিনী ছিল কিন্তু কেউ আর ধরে রাখে নি। মাহারী বা উপাধির বাৎসরিক মিটিং মেলা নেই, বংশ পরম্পরায় বলার রেওয়াজ নেই, তাই সব হারিয়ে গেছে। আসলে ঘটনা অবস্থানকে ধরে রাখার জন্যই নামের পেছনে চাৎচি মাহারি বা উপাধি নেওয়ার ঘটনা কাহিনীগুলো বলার শুনানোর ব্যবস্থা না থাকলে এক সময় হারিয়ে যাবেই।
আবার এক কাহিনীতে নতুন কথা শুনতে পাই, গারোদের মাঝে বড় মাচং চাৎচি বা উপাধির মাঝে সাংমা মারাক মোমিন এ তিনটাকেই বেশি দেখা যায়। এই কাহিনী বলে গাবিল মাচং চাৎচি বা উপাধিরাই নাকি সর্বপ্রথম মোমিন শব্দটি লিখে বা নেয়। মোমিন শব্দটি মুসলমান ধর্মের আরবি ভাষার মোমেন শব্দ থেকে এসেছে। এক ঘাগ্রা মহিলার ছেলে মেয়েরা দীর্ঘ দিন আফগানিস্তানের রাজধানী কাবুলে থেকে মুসলিম ধর্মের সাথে যুক্ত হয়ে মোমেন শব্দের সাথে পরিচয় ঘটে, এ মোমেন থেকে পরবর্তীতে মোমিন বড় মাচং চাৎচি বা উপাধি হয় বলে। পরে গারো এলাকায় আত্মীয়-স্বজনের কাছে সদলবলে এসে নামের পেছনে গাবিল মোমিন বা জি মোমিন লিখে নেয় বলে। গাবিল উপাধি যারা লেখে বা নেয় তাদের সংখ্যা বেশি দেখা যায় না, বাংলাদেশে চার-পাঁচ পরিবার দেখা যায়, মেঘালয় রাজ্যে মোটামুটি দেখা যায়, আবার অনেকে বলে তারা এখন ঘাগ্রা হয়ে গেছে। মোমিন শব্দের বিভিন্ন রকম ব্যাখ্যা পাওয়া যায়, কোন লেখক সরাসরি ব্যাখ্যা ছাড়া লিখেছে, আবার কোন লেখক মোমিন শব্দের ব্যাখ্যা দিয়ে লিখেছে। গারোদের শক্তিশালী লেখক দেওয়ান সিং রংমুতো তাঁর ‘আপাসং আগানা’ বইয়ের ২২৯ পৃষ্টায় লেখেন, এ লেখক বাংলাদেশের নয় মেঘালয় রাজ্যের গারো হিলসের। এহেরা স্ত্রীর নাম, বেহেরা স্বামীর নাম। তাদের এক ছেলের নাম আচিক, এ আচিকের এক ছেলে মহর প্রথম মোমিন বড় মাচং চাৎচি বা উপাধি নেয়, লেখে। কেন মহর মোমিন বড় উপাধি নিয়েছে তার কোন ব্যাখ্যা দেওয়া হয় নি, সাধারণত গারোরা মহিলাদের কাজ থেকে উপাধি নেওয়া শুরু করে, এখানে মহর নাম দেখে পুরুষ মনে হলো। মেঘালয় রাজ্যের আরেক বিশিষ্ট লেখক মিহির এন. সাংমা তাঁর ‘গিম্মা গিমিন আচিকরাংনি আদকরাং’ বইয়ের ১৩ পৃষ্টায় লেখেন সম্মানিত গারো পাঁচ মহিলাকে রাতে ঘুমানোর সময় স্বপ্নে মিৎদে বা দেবতারা উপাধি নিতে আদেশ দেয়। রানজা মা মহিলা যেন সাংমা উপাধি নেয়, মাককাল মা যেন মারাক উপাধি নেয়, রানজিং মা যেন মোমিন উপাধি নেয়, দেদেংমা আরেং ও নাদাংমা মহিলা যেন শিরা বড় মাচং চাৎচি বা উপাধি নেয়। এটাকে অনেক গারো বয়স্ক লোকেরা বলে মিৎদে মান্দেনি চাসংও বাংলায় দেবতার যুগে বা সত্য যুগে এ সাংমা মারাক মোমিন আরেং শিরাকে মিৎদে বা দেবতারা গারোদেরকে দিয়েছিল। এত আগের যুগকে গারোরা গারো ভাষায় এভাবে বোঝাতে চায়, চাৎচি বাজু অংকুজা, মাহারি মাচং চানকুজা, আইন-কানুন খাকুজা, তার মানে গারোদের উপাধি আইন কানুন কিছুই হয় নি।
কোনটা সঠিক, কোনটা বেঠিক, যাচাই করা খুবই কঠিন। হয়ত কারো কারো জানা মতে মোমিনের আরো কাহিনী ইতিহাস থাকতেও পারে। গারোদের মুখে মুখে ধরে রাখা কাহিনীগুলো একই অবস্থায় নাও থাকতে পারে। কেউ হয়ত কাহিনী ইতিহাসটি বেশি জোরাতালি দিয়ে লম্বা করেছে, আবার কেউ হয়ত কাহিনীর শুধু সারকথাগুলো বলেছে, রং রস অলংকার সৌন্দর্য দেয় নি।
মেঘালয় রাজ্যের গারোরা নামের সংস্কৃতি পুরোপুরি মেনে চলে যেমন পূর্ণ এ. সাংমা। এ মহান গারো এক সময় ভারতের পার্লামেন্টের স্পিকার ছিলেন। পূর্ণ নাম, এ মানে আগিদক, পরে সাংমা। ইংরেজিতে তার নাম সবসময় P. A. Sangma লেখা হয়, P মানে Purno, A মানে A•gidok, পরে Sangma এটাই গারোদের আসল নামের সংস্কৃতি চর্চা। আমি আমার নাম লিখি তর্পণ ঘাগ্রা, ভারতের মেঘালয় রাজ্যে বসবাস করলে আমাকে লিখতে হতো তর্পণ ঘাগ্রা মোমিন বা তর্পণ জি মোমিন। বাংলাদেশের গারোদের নামের সংস্কৃতি রক্ষার কোন চেষ্টা নেই। এখানে বড় মাচং চাৎচি বা উপাধি সাংমা মারাক মোমিন লেখার অভ্যাস নেই, বেশির ভাগ গারোরা ব্যবহার করে না, হয়ত জানে না, অথবা ভাল লাগে না, ছোট মাচং চাৎচি বা উপাধি চিসিম, ঘাগ্রা, রিছিল, ম্রং লিখেই শেষ। আবার যারা সাংমা মারাক লিখে তারাও নামের পরে সরাসরি সাংমা মারাক লিখে, মাঝখানের ছোট মাচং চাৎচি বা উপাধির দরকার নেই। বা তাদের পছন্দ নয়, ইচ্ছে মতো নেয়। কোন নিয়ম কানুন অনুসরণ করে না। ফলে কি সাংমা- চিসিম সাংমা, দাওয়া সাংমা, নাকি স্নাল সাংমা কিছুই বোঝা যায় না। আবার মারাকরাও- ম্রং মারাক, নাকি রাংসা মারাক, সরাসরি লিখলে বোঝা খুবই কঠিন।
লেখাটি শেয়ার করুন...


0 Comments