সম্প্রতি ভাষা নিয়ে একটি গবেষণায় যুক্ত হয়ে যাওয়া হয়েছিল পার্বত্য চট্টগ্রাম। বান্দরবান, রাঙামাটি হয়ে খাগড়াছড়ি পৌঁছি ১৯ তারিখ। ২১ মে সন্ধ্যায় ‘মারমা উন্নয়ন সমাজ’ এর নেতৃবৃন্দদের ভাষা নিয়ে কাজ, অভিজ্ঞতাগুলো শুনছিলাম ‘মারমা বাগান মালিক সমিতি’র অফিস ঘরে বসে। আট-দশজনের নেতানেত্রীদের টিমে কথা বলছিলেন প্রায় সবাই। অনেকক্ষণ চুপচাপ থাকার পর মুখ খুললেন একজন, বললেন, ‘আমার জীবনের বাস্তব ঘটনার কথা বলি’। উনার সেই বাস্তব জীবনে ঘটে যাওয়া ঘটনাটি মনে দাগ কেটে গিয়েছিল। সেই ঘটনাটি সহভাগিতা করতে চাই আপনাদের সবার সাথে। মারমা জাতির বাবু শৈ চৌধুরী তার সন্তানকে চট্টগ্রামে রাখতেন এক হোস্টেলে। সন্তান ক্লাস সেভেনে পড়ে। হোস্টেলের নিয়ম-কানুন খুব কড়া। সপ্তাহে একদিন কথা বলা যায় বাড়ির লোকদের সাথে। হোস্টেলে পাহাড়ি-বাঙালি সবাই একত্রে থাকে। একবার কাঁদো কাঁদো সুরে সন্তান ফোন করে জানাল, বাবা, হোস্টলে নতুন নিয়ম করেছে, আমরা নাকি হোস্টেলে আর মাতৃভাষায় কথা বলতে পারব না। ‘কেন কি হয়েছে?’ -একটা ঝামেলা হয়েছিল। আমাদের সবার কথা বুঝতে পারে না, তাই নাকি কর্তৃপক্ষের এই নতুন নিয়ম।
তিনি বললেন, ফোনটা হোস্টেল ইনচার্জের কাছে দিতে। হোস্টেল ইনচার্জকে বললেন, আপনি যে নতুন নিয়মটা করতে যাচ্ছেন, তা কি জেনেবুঝে করছেন? আপনি আপনার সন্তানের সাথে কথা বলেন কোন ভাষায়? মাতৃভাষা বাদে অন্য ভাষায়? আপনারা যদি এই নিয়ম করেন, তাহলে আমার সন্তানকে আমি আর আপনাদের হোস্টেলে রাখব না। আর যেইসব বাক্য বিনিময় হয়েছিল সেদিন হোস্টেল ইনচার্জের সাথে, বাড়ি থেকে দূরে সন্তানকে রেখেছি আপনাদের কাছে। সপ্তাহে একদিন মাত্র কথা হয় মায়ের সাথে সন্তানের। মাতৃভাষায়ই যদি মা-ছেলে কথা বলতে না পারে, আপনার কি মনে হয়, তারা মন খুলে কথা বলতে পারবে? তাদের মন ভরবে? এই প্রশ্নটিও যোগ করেছিলেন, আপনি কি জানেন যে, ২১ শে ফেব্রুয়ারি এখন আন্তর্জাতিক
মাতৃভাষা দিবস।
ছেলেকে হোস্টেল থেকে ছাড়িয়ে আনা আর এমন সব বাক্যের প্রতিবাদে হোস্টেল ইনচার্জ সেদিন অনেকটা চুপসে গিয়েছিলেন। বাধ্য হয়েছিলেন সেই সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করতে।
আরেকটা ঘটনার কথা বলি, গারো স্টুডেন্ট ফেডারেশন (জি.এস.এফ.) এর সাধারণ সম্পাদক লিয়াং রিছিল মাতৃভাষায় কথা বলতে খুবই পারদর্শী। গতবারের আগেরবার তাঁর নিজ এলাকায় ৯ আগস্ট বিশ্ব আদিবাসী দিবস উদযাপনের সময় নিজ ভাষায় বক্তব্যের সময় বলেছিলেন, ‘আমরা কি জনবিরোধী কোন প্রকল্প চাই?’ ‘আমরা কি প্রাণ বিরোধী কোন প্রকল্প চাই?’ সামনে বসা হাজারো শ্রোতা তাতে সমর্থন জানিয়ে হাত তুলে না, না, করে উঠেছিলেন। আর ভাষা না জানায় মঞ্চের প্রধান অতিথি, বিশেষ অতিথিদের মনে প্রশ্ন জেগেছিল, ‘কি বলে?’। যদিও মন্দ কিছুই বলেন নি তিনি। পরের বছর মঞ্চে বক্তৃতার আগেই বলে দেয়া হয়েছিল, নিজ ভাষায় যাতে বক্তব্য না দেয়! তিনি সেদিন বাংলায় বলেছিলেন, ‘ভাষার জন্য আন্দোলন করে যে দেশ স্বাধীন হয়েছে, সেই দেশে আর আজকে বিশ্ব আদিবাসী দিবসের দিনেই যদি আমি মায়ের ভাষায় কথা বলতে না পারি, তবে কোন দিন বলব? আমি বিনীতভাবে এর প্রতিবাদ জানাই’। এভাবেই প্রতিবাদ জানানো হয়েছিল মায়ের ভাষায় কথা বলতে না দেয়ার বিপরীতে।
এভাবে কখনো আমরা না বুঝেই মাতৃভাষার শত্রুপক্ষের কাতারে গিয়ে শামিল হই! আমার মায়ের ভাষা আমার কাছে যতটা মধুর, সবার মাতৃভাষা তাঁদের কাছে সমান মধুর। তাই সচেতন থাকতে হবে, ভুলেও যাতে কারো মাতৃভাষাকে আঘাত দিয়ে না ফেলি।
আর আমরা নিজেদের মধ্যে কথা বলায়, মিটিং-য়ে, আলোচনায় নিজেদের মাতৃভাষার ব্যবহারই যাতে নিশ্চিত করি। মাতৃভাষার ব্যবহার প্রসারতা লাভ করুক। পৃথিবীর সকল মাতৃভাষা স-সম্মানে বেঁচে থাকুক।
পরাগ রিছিল: কবি ও লেখক।
লেখাটি শেয়ার করুন...


0 Comments